মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাতে নতুন মোড় নিয়েছে ড্রোন যুদ্ধ। ইরানের সস্তা কিন্তু কার্যকর ‘শাহেদ’ ড্রোনের আদলে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে নতুন কম খরচের আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবস্থা, যার নাম ‘লুকাস’। সাম্প্রতিক সময়ে এই ড্রোন প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে মার্কিন বাহিনী। লক্ষ্য ছিল অবকাঠামোতে আঘাত হানা এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করা।
মার্কিন সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি ড্রোনের মডেল অনুসরণ করে তৈরি এই কমদামি ড্রোন এখন ‘আমেরিকান প্রতিশোধ’ পৌঁছে দিচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে।
ইরানি প্রযুক্তি থেকে মার্কিন পরিকল্পনা
পারস্য উপসাগর অঞ্চলে বিমানবন্দর, বহুতল ভবন ও কূটনৈতিক স্থাপনায় ইরানি ড্রোন হামলা শুরু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো মোকাবিলার উপায় খুঁজছিল। দুই হাজার চব্বিশ সালে মার্কিন সামরিক গবেষকরা ‘শাহেদ’ ড্রোনের নকশা বিশ্লেষণ করে সেটিকে উল্টোভাবে তৈরি করার উদ্যোগ নেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিরক্ষা অনুশীলন এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করা।

কিন্তু পরে একটি নতুন ধারণা আসে। যদি ইরানের ড্রোন এত সস্তা ও কার্যকর হয়, তবে সেটির আদলেই কেন নিজেদের অস্ত্র তৈরি করা হবে না। সেই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় ‘লুকাস’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের কম খরচের যুদ্ধ ড্রোন।
গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো মার্কিন বাহিনী এটি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা চালায়।
কম দামে বড় ক্ষমতা
‘শাহেদ’ এবং ‘লুকাস’ ড্রোনের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন মিটার এবং ডানার বিস্তার আড়াই মিটারের মতো। এগুলোর নাকে বিস্ফোরক থাকে, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরিত হয়।
লক্ষ্যবস্তুর স্থানাঙ্ক আগে থেকে নির্ধারণ করে দিলে এই ড্রোন শত শত কিলোমিটার দূর পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়ে যেতে পারে। প্রতিটি ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার ডলার, যা একটি ব্যয়বহুল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম।
ফলে আগে যেখানে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে অপেক্ষাকৃত কম খরচেই হামলা চালানো সম্ভব।

যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিচ্ছে ড্রোন
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত প্রযুক্তি অনুকরণ করা এবং কম খরচে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি করার ক্ষমতা ভবিষ্যতের যুদ্ধের চেহারা বদলে দিচ্ছে।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, দ্রুত উৎপাদন এবং নিখুঁত লক্ষ্য নির্ধারণের প্রযুক্তি মিলিয়ে সস্তা ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রে বড় শক্তি হয়ে উঠছে। এতে ছোট দেশ বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিও দূরপাল্লার হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে।
প্রযুক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
‘লুকাস’ ড্রোন তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ড্রোনটি উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পথ নির্ধারণ করে।
এটি দেখাচ্ছে যে বাণিজ্যিক প্রযুক্তির উন্নতি কীভাবে দ্রুত নতুন ধরনের অস্ত্র তৈরি করতে সাহায্য করছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য প্রযুক্তি নয়, বরং এর দ্রুত উন্নয়ন। প্রতিপক্ষের অস্ত্র বিশ্লেষণ করে মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তার নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সীমাবদ্ধতাও আছে
কম খরচের এই ড্রোনগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এগুলো তুলনামূলক ধীরগতির এবং শব্দ বেশি হওয়ায় সহজে শনাক্ত করা যায়। বহন করতে পারে সীমিত পরিমাণ বিস্ফোরক। এছাড়া ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে এগুলোর নেভিগেশন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব।
তবুও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব ব্যবস্থায় আরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হতে পারে।
ইরানের বিস্তৃত ড্রোন কৌশল
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের ড্রোন হামলা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, ড্রোন আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের উঁচু ভবন, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিস্ফোরণ ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করাও। এতে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয় এবং বিশ্বমাধ্যমে বড় প্রভাব পড়ে।

ইরান বিপুল সংখ্যক ড্রোন গোপনে সংরক্ষণ করেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে বড় আকারে ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে নেওয়া শিক্ষা
ইউক্রেন যুদ্ধেও ‘শাহেদ’ ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। এত বেশি হামলা হয়েছে যে সেখানে ড্রোনটির নাম সাধারণ মানুষের মধ্যেও পরিচিত হয়ে গেছে।
ইউক্রেন সেনাবাহিনী ড্রোন শনাক্ত করতে ক্যামেরা ও শব্দ শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এগুলো ধ্বংস করতে মেশিনগান, ইলেকট্রনিক অস্ত্র, জাল এবং এমনকি অন্য ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেই অভিজ্ঞতাই এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন কৌশল তৈরিতে কাজে লাগছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















