০২:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬
ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রতারণা: শীর্ষ কর্মকর্তার পরিচয়ে যুবক গ্রেপ্তার, বেরিয়ে এলো চক্রের কৌশল বরিশালে হামের ভয়াবহ বিস্তার, তিন মাসে ৭ শিশুর মৃত্যু চুয়াডাঙ্গা ও নাটোরে অভিযান, অনিয়মে দুই লাখ টাকা জরিমানা শরিয়াহ মানদণ্ডে ফাঁক, আস্থার সংকট—ইসলামী ব্যাংকিংয়ে সংস্কারের ডাক ঢাকার শহীদ মিনার এলাকায় অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার তিস্তা সীমান্তে জ্বালানি চোরাচালান ঠেকাতে কড়াকড়ি, অভিযানে সক্রিয় বিজিবি সায়েদাবাদে বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল তরুণীর, ঢাকায় আবারও সড়ক নিরাপত্তা প্রশ্নে হাম ফিরে এলো ভয়ংকর রূপে, বাড়ছে শিশু মৃত্যু—জরুরি পদক্ষেপে সরকার সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক আরও দুই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো সারা দেশে হামের অ্যালার্ম: টিকার ঘাটতি, অবহেলা ও পুষ্টিহীনতায় ঝুঁকিতে শিশুরা

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির প্রথম ভাষণের পূর্ণ কপি: শহীদদের প্রতিশোধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার

(ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতির মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ দেন। নিচে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ অনুবাদ তুলে ধরা হলো।)

“আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী এবং তাঁর নিদর্শনের সত্য ব্যাখ্যাকারী।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর পথে প্রবেশের দ্বার এবং তাঁর ধর্মের রক্ষক।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তাঁর সত্যের সমর্থক।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর প্রমাণ এবং তাঁর ইচ্ছার পথপ্রদর্শক।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে যাঁকে সামনে আনা হয়েছে এবং যার ওপর আশা রাখা হয়েছে।

আপনাদের ওপর সর্বাঙ্গীণ শুভেচ্ছা ও শান্তি বর্ষিত হোক।

হে আমার প্রভু, যুগের প্রভু—আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

আমি আমার প্রভু ইমাম মাহদির কাছে বিপ্লবের মহান নেতা, প্রজ্ঞাবান ও প্রিয় খামেনির হৃদয়বিদারক শাহাদাতের জন্য শোক প্রকাশ করছি।

যেভাবে বেছে নেওয়া হবে খামেনির উত্তরসূরি | The Daily Star

আমি তাঁর পবিত্র দরবারে প্রার্থনা করি যেন তিনি মহান ইরানি জাতির প্রতিটি সদস্যের জন্য—এমনকি বিশ্বের সব মুসলমান, ইসলাম ও বিপ্লবের সেবক, নিঃস্বার্থ কর্মী এবং ইসলামী আন্দোলনের শহীদদের পরিবার, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহতদের জন্য—রহমতের দোয়া করেন। একই সঙ্গে আমি বিনীতভাবে নিজের জন্যও তাঁর দোয়া কামনা করছি।

ইরানের জনগণের উদ্দেশে

আমার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশ মহান ইরানি জাতির উদ্দেশে।

প্রথমেই বিশেষজ্ঞ পরিষদের ভোট সম্পর্কে আমার অবস্থান সংক্ষেপে জানাতে চাই। আমি, আপনাদের সেবক মুজতবা হোসেইনি খামেনি, আপনাদের মতোই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সম্প্রচার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জেনেছি।

মহান খোমেনি ও শহীদ খামেনির মতো দুই মহান নেতার স্থানে বসা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন।

এই পদে আগে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি আল্লাহর পথে ষাট বছরেরও বেশি সময় সংগ্রাম করেছেন এবং সব ধরনের পার্থিব আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে এই দেশের শাসকদের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল রত্নে পরিণত হয়েছেন।

তাঁর শাহাদাতের পর আমি তাঁর দেহ দেখতে যাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম। সেখানে আমি অটল শক্তির এক পাহাড় দেখেছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, আহত হাতের মুঠিও তখন শক্ত করে বন্ধ ছিল।

এমন একজন নেতার পর নেতৃত্ব গ্রহণ করা কঠিন। আল্লাহর সাহায্য এবং আপনাদের সমর্থন ছাড়া এই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়।

যদি ইরানি জনগণের শক্তি ময়দানে দৃশ্যমান না হয়, তবে নেতা কিংবা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকর হতে পারবে না—যাদের প্রকৃত মর্যাদা জনগণের সেবা করার মধ্যেই নিহিত।

এই যুদ্ধের দিন ও রাতগুলোতে আপনারা যেভাবে উপস্থিতি দেখিয়েছেন, তা অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

আমি আপনাদের কুদস দিবসের সমাবেশে অংশ নেওয়ার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, যেখানে শত্রুকে পরাস্ত করার সংকল্পই সবার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ইরানে কুদস দিবসের মিছিলে লাখো মানুষ: ফিলিস্তিন ও নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি  অকুন্ঠ সমর্থন

একজন আরেকজনকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবেন না। আল্লাহর রহমতে এটি ইরানিদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। এই কঠিন সময়ে এই গুণ আরও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাওয়া উচিত।

আমি সব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান জানাই যেন তারা অভাবগ্রস্ত নাগরিকদের সহায়তায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়।

এই নির্দেশনা মেনে চললে মহান ও গৌরবময় ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত হবে। ইনশাআল্লাহ এর প্রথম ফল হবে চলমান যুদ্ধে শত্রুর ওপর বিজয়।

সেনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

আমার বক্তব্যের তৃতীয় অংশ আমাদের সাহসী যোদ্ধাদের উদ্দেশে।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি যখন অহংকারের শক্তিধর দেশগুলোর আক্রমণের মুখে, তখন আমি সাহসী যোদ্ধাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

ইরানি যোদ্ধারা তাদের কঠোর আঘাতে শত্রুর পথ রোধ করেছে এবং আমাদের দেশকে ধ্বংস করার তাদের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

হে আমার সহযোদ্ধারা, ইরানি জনগণ চায় এমন প্রতিরক্ষা অব্যাহত থাকুক যা শত্রুকে অনুতপ্ত করবে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার কৌশলগত চাপ অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

যেসব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিল ইরান

শত্রু যেখানে কম অভিজ্ঞ এবং বেশি দুর্বল, সেখানে নতুন ফ্রন্ট খোলার বিষয়েও গবেষণা হয়েছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ফ্রন্ট সক্রিয় করা হবে।

প্রতিরোধ ফ্রন্টের যোদ্ধাদের প্রতিও আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমরা প্রতিরোধ ফ্রন্টের দেশগুলোকে আমাদের নিকটতম বন্ধু মনে করি। প্রতিরোধ আন্দোলন ইসলামী বিপ্লবের মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রতিরোধ ফ্রন্টের সদস্যদের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে জায়নবাদী ষড়যন্ত্রের অবসান দ্রুত করবে।

আমরা দেখেছি, বিশ্বস্ত ইয়েমেন গাজার নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বন্ধ করেনি। সব বাধা সত্ত্বেও আত্মত্যাগী হিজবুল্লাহ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে এবং ইরাকের প্রতিরোধ বাহিনীও একই পথে এগিয়েছে।

শহীদদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশে

গত কয়েক দিনে যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন বা যাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—তাদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য।

শহীদদের পরিবারের প্রতি আমি সমবেদনা জানাই। আমিও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। আমার পিতার পাশাপাশি আমি আমার বিশ্বস্ত স্ত্রী, আত্মত্যাগী বোন ও তার ছোট সন্তান এবং আরেক বোনের স্বামীকেও শহীদদের কাফেলায় সমর্পণ করেছি।

কিন্তু ধৈর্য ধারণকে সহজ করে তোলে আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুতি—ধৈর্যশীলদের জন্য মহান প্রতিদান রয়েছে।

আমি সবাইকে আশ্বস্ত করছি, আপনাদের শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ আমরা অবশ্যই নেব।

এই প্রতিশোধ শুধু বিপ্লবের মহান নেতার শাহাদাতের জন্য নয়। শত্রুর হাতে নিহত প্রতিটি নাগরিকের জন্য আলাদা প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

এর একটি অংশ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু পূর্ণ প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত এই বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকবে। বিশেষ করে আমাদের শিশুদের রক্তের বিষয়ে আমরা আরও সংবেদনশীল।

মিনাবের শাজারায়ে তাইয়্যিবা স্কুলে শত্রুর হামলার মতো অপরাধগুলো প্রতিশোধের প্রক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

এগুলো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব এবং তাদের বাস্তবায়নের রিপোর্ট আমাকে দিতে হবে।

যেকোনো অবস্থায় আমরা শত্রুর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করব। তারা অস্বীকার করলে আমরা তাদের সম্পদ জব্দ করব, আর তা সম্ভব না হলে সমপরিমাণ সম্পদ ধ্বংস করব।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রথম জনসমক্ষে বক্তব্য

প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি বার্তা

আমার বক্তব্যের পঞ্চম অংশ কিছু আঞ্চলিক দেশের নেতাদের উদ্দেশে।

আমাদের ১৫টি দেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে এবং আমরা সবসময় তাদের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক চাই। কিন্তু বহু বছর ধরে শত্রুরা কিছু দেশে সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে, যাতে তারা অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক হামলায় এসব ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আমরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করার পর কেবল সেসব দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছি। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে আমরা একই পথ অনুসরণ করব। তবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি আমাদের রয়েছে।

আঞ্চলিক দেশগুলোকে ঠিক করতে হবে তারা আক্রমণকারীদের পক্ষে থাকবে, নাকি আমাদের জনগণের হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

আমি তাদের নেতাদের পরামর্শ দিচ্ছি, যত দ্রুত সম্ভব মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শান্তির প্রতিশ্রুতি আসলে মিথ্যা।

এই ঘাঁটি বন্ধ করলে তাদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হবে এবং তাদের শক্তি ও সম্পদও বৃদ্ধি পাবে।

আমি আবারও বলছি—ইসলামী প্রজাতন্ত্র এই অঞ্চলে আধিপত্য বা উপনিবেশ স্থাপন করতে চায় না। বরং আমরা সব প্রতিবেশীর সঙ্গে আন্তরিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক চাই।

শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা

হে নেতা, আপনার বিদায়ে আমাদের হৃদয় শোকাহত। আপনি সবসময় এমন পরিণতি কামনা করতেন এবং অবশেষে পবিত্র রমজান মাসের দশম দিনের সকালে কোরআন তিলাওয়াতের সময় আল্লাহ আপনাকে সেই মর্যাদা দিয়েছেন।

আপনি বহু অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু কখনও পিছিয়ে যাননি।

সম্ভবত অনেক মানুষ আপনার প্রকৃত মর্যাদা জানত না। হয়তো দীর্ঘ সময় পর ইতিহাস আপনার প্রকৃত মহিমা উন্মোচন করবে।

আমরা আশা করি, শহীদদের ও আল্লাহর বন্ধুদের সান্নিধ্যে থেকে আপনি এই জাতি এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের সব জাতির অগ্রগতির জন্য দোয়া করবেন।

হে শহীদ নেতা, আমরা আপনাকে অঙ্গীকার করছি—সত্যের পতাকাকে উঁচু রাখতে এবং আপনার পবিত্র লক্ষ্য পূরণে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাব।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আহত হলেও 'সুস্থ ও নিরাপদ' আছেন

শেষ কথা

আমার বক্তব্যের সপ্তম অংশে আমি ধন্যবাদ জানাই সকলকে—মহান ধর্মীয় নেতাদের, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এবং সেইসব মানুষকে যারা এসে আনুগত্য নবায়ন করেছেন।

আমি সরকারে তিনটি বিভাগের কর্মকর্তা এবং অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমি আশা করি এই পবিত্র দিনগুলোতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ইরানের জনগণ, বিশ্বের সব মুসলমান এবং নিপীড়িত মানুষের ওপর বর্ষিত হবে।

সবশেষে আমি প্রার্থনা করি, রমজানের এই শেষ দিনগুলোতে আল্লাহ আমাদের জাতিকে শত্রুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় দান করুন এবং সবার জন্য মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করুন।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।”

জনপ্রিয় সংবাদ

ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রতারণা: শীর্ষ কর্মকর্তার পরিচয়ে যুবক গ্রেপ্তার, বেরিয়ে এলো চক্রের কৌশল

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির প্রথম ভাষণের পূর্ণ কপি: শহীদদের প্রতিশোধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার অঙ্গীকার

০৪:৩৩:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

(ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতির মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ দেন। নিচে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ অনুবাদ তুলে ধরা হলো।)

“আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী এবং তাঁর নিদর্শনের সত্য ব্যাখ্যাকারী।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর পথে প্রবেশের দ্বার এবং তাঁর ধর্মের রক্ষক।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তাঁর সত্যের সমর্থক।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে আল্লাহর প্রমাণ এবং তাঁর ইচ্ছার পথপ্রদর্শক।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক—হে যাঁকে সামনে আনা হয়েছে এবং যার ওপর আশা রাখা হয়েছে।

আপনাদের ওপর সর্বাঙ্গীণ শুভেচ্ছা ও শান্তি বর্ষিত হোক।

হে আমার প্রভু, যুগের প্রভু—আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

আমি আমার প্রভু ইমাম মাহদির কাছে বিপ্লবের মহান নেতা, প্রজ্ঞাবান ও প্রিয় খামেনির হৃদয়বিদারক শাহাদাতের জন্য শোক প্রকাশ করছি।

যেভাবে বেছে নেওয়া হবে খামেনির উত্তরসূরি | The Daily Star

আমি তাঁর পবিত্র দরবারে প্রার্থনা করি যেন তিনি মহান ইরানি জাতির প্রতিটি সদস্যের জন্য—এমনকি বিশ্বের সব মুসলমান, ইসলাম ও বিপ্লবের সেবক, নিঃস্বার্থ কর্মী এবং ইসলামী আন্দোলনের শহীদদের পরিবার, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহতদের জন্য—রহমতের দোয়া করেন। একই সঙ্গে আমি বিনীতভাবে নিজের জন্যও তাঁর দোয়া কামনা করছি।

ইরানের জনগণের উদ্দেশে

আমার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশ মহান ইরানি জাতির উদ্দেশে।

প্রথমেই বিশেষজ্ঞ পরিষদের ভোট সম্পর্কে আমার অবস্থান সংক্ষেপে জানাতে চাই। আমি, আপনাদের সেবক মুজতবা হোসেইনি খামেনি, আপনাদের মতোই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সম্প্রচার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জেনেছি।

মহান খোমেনি ও শহীদ খামেনির মতো দুই মহান নেতার স্থানে বসা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন।

এই পদে আগে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি আল্লাহর পথে ষাট বছরেরও বেশি সময় সংগ্রাম করেছেন এবং সব ধরনের পার্থিব আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে এই দেশের শাসকদের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল রত্নে পরিণত হয়েছেন।

তাঁর শাহাদাতের পর আমি তাঁর দেহ দেখতে যাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম। সেখানে আমি অটল শক্তির এক পাহাড় দেখেছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, আহত হাতের মুঠিও তখন শক্ত করে বন্ধ ছিল।

এমন একজন নেতার পর নেতৃত্ব গ্রহণ করা কঠিন। আল্লাহর সাহায্য এবং আপনাদের সমর্থন ছাড়া এই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়।

যদি ইরানি জনগণের শক্তি ময়দানে দৃশ্যমান না হয়, তবে নেতা কিংবা রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকর হতে পারবে না—যাদের প্রকৃত মর্যাদা জনগণের সেবা করার মধ্যেই নিহিত।

এই যুদ্ধের দিন ও রাতগুলোতে আপনারা যেভাবে উপস্থিতি দেখিয়েছেন, তা অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

আমি আপনাদের কুদস দিবসের সমাবেশে অংশ নেওয়ার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, যেখানে শত্রুকে পরাস্ত করার সংকল্পই সবার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ইরানে কুদস দিবসের মিছিলে লাখো মানুষ: ফিলিস্তিন ও নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি  অকুন্ঠ সমর্থন

একজন আরেকজনকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবেন না। আল্লাহর রহমতে এটি ইরানিদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। এই কঠিন সময়ে এই গুণ আরও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাওয়া উচিত।

আমি সব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান জানাই যেন তারা অভাবগ্রস্ত নাগরিকদের সহায়তায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালায়।

এই নির্দেশনা মেনে চললে মহান ও গৌরবময় ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত হবে। ইনশাআল্লাহ এর প্রথম ফল হবে চলমান যুদ্ধে শত্রুর ওপর বিজয়।

সেনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

আমার বক্তব্যের তৃতীয় অংশ আমাদের সাহসী যোদ্ধাদের উদ্দেশে।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি যখন অহংকারের শক্তিধর দেশগুলোর আক্রমণের মুখে, তখন আমি সাহসী যোদ্ধাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

ইরানি যোদ্ধারা তাদের কঠোর আঘাতে শত্রুর পথ রোধ করেছে এবং আমাদের দেশকে ধ্বংস করার তাদের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছে।

হে আমার সহযোদ্ধারা, ইরানি জনগণ চায় এমন প্রতিরক্ষা অব্যাহত থাকুক যা শত্রুকে অনুতপ্ত করবে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার কৌশলগত চাপ অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

যেসব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিল ইরান

শত্রু যেখানে কম অভিজ্ঞ এবং বেশি দুর্বল, সেখানে নতুন ফ্রন্ট খোলার বিষয়েও গবেষণা হয়েছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ফ্রন্ট সক্রিয় করা হবে।

প্রতিরোধ ফ্রন্টের যোদ্ধাদের প্রতিও আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমরা প্রতিরোধ ফ্রন্টের দেশগুলোকে আমাদের নিকটতম বন্ধু মনে করি। প্রতিরোধ আন্দোলন ইসলামী বিপ্লবের মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রতিরোধ ফ্রন্টের সদস্যদের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে জায়নবাদী ষড়যন্ত্রের অবসান দ্রুত করবে।

আমরা দেখেছি, বিশ্বস্ত ইয়েমেন গাজার নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বন্ধ করেনি। সব বাধা সত্ত্বেও আত্মত্যাগী হিজবুল্লাহ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে এবং ইরাকের প্রতিরোধ বাহিনীও একই পথে এগিয়েছে।

শহীদদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশে

গত কয়েক দিনে যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন বা যাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—তাদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য।

শহীদদের পরিবারের প্রতি আমি সমবেদনা জানাই। আমিও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। আমার পিতার পাশাপাশি আমি আমার বিশ্বস্ত স্ত্রী, আত্মত্যাগী বোন ও তার ছোট সন্তান এবং আরেক বোনের স্বামীকেও শহীদদের কাফেলায় সমর্পণ করেছি।

কিন্তু ধৈর্য ধারণকে সহজ করে তোলে আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুতি—ধৈর্যশীলদের জন্য মহান প্রতিদান রয়েছে।

আমি সবাইকে আশ্বস্ত করছি, আপনাদের শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ আমরা অবশ্যই নেব।

এই প্রতিশোধ শুধু বিপ্লবের মহান নেতার শাহাদাতের জন্য নয়। শত্রুর হাতে নিহত প্রতিটি নাগরিকের জন্য আলাদা প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

এর একটি অংশ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু পূর্ণ প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত এই বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকবে। বিশেষ করে আমাদের শিশুদের রক্তের বিষয়ে আমরা আরও সংবেদনশীল।

মিনাবের শাজারায়ে তাইয়্যিবা স্কুলে শত্রুর হামলার মতো অপরাধগুলো প্রতিশোধের প্রক্রিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

এগুলো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব এবং তাদের বাস্তবায়নের রিপোর্ট আমাকে দিতে হবে।

যেকোনো অবস্থায় আমরা শত্রুর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করব। তারা অস্বীকার করলে আমরা তাদের সম্পদ জব্দ করব, আর তা সম্ভব না হলে সমপরিমাণ সম্পদ ধ্বংস করব।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রথম জনসমক্ষে বক্তব্য

প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি বার্তা

আমার বক্তব্যের পঞ্চম অংশ কিছু আঞ্চলিক দেশের নেতাদের উদ্দেশে।

আমাদের ১৫টি দেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে এবং আমরা সবসময় তাদের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক চাই। কিন্তু বহু বছর ধরে শত্রুরা কিছু দেশে সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে, যাতে তারা অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক হামলায় এসব ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আমরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করার পর কেবল সেসব দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছি। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে আমরা একই পথ অনুসরণ করব। তবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি আমাদের রয়েছে।

আঞ্চলিক দেশগুলোকে ঠিক করতে হবে তারা আক্রমণকারীদের পক্ষে থাকবে, নাকি আমাদের জনগণের হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

আমি তাদের নেতাদের পরামর্শ দিচ্ছি, যত দ্রুত সম্ভব মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শান্তির প্রতিশ্রুতি আসলে মিথ্যা।

এই ঘাঁটি বন্ধ করলে তাদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হবে এবং তাদের শক্তি ও সম্পদও বৃদ্ধি পাবে।

আমি আবারও বলছি—ইসলামী প্রজাতন্ত্র এই অঞ্চলে আধিপত্য বা উপনিবেশ স্থাপন করতে চায় না। বরং আমরা সব প্রতিবেশীর সঙ্গে আন্তরিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক চাই।

শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা

হে নেতা, আপনার বিদায়ে আমাদের হৃদয় শোকাহত। আপনি সবসময় এমন পরিণতি কামনা করতেন এবং অবশেষে পবিত্র রমজান মাসের দশম দিনের সকালে কোরআন তিলাওয়াতের সময় আল্লাহ আপনাকে সেই মর্যাদা দিয়েছেন।

আপনি বহু অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু কখনও পিছিয়ে যাননি।

সম্ভবত অনেক মানুষ আপনার প্রকৃত মর্যাদা জানত না। হয়তো দীর্ঘ সময় পর ইতিহাস আপনার প্রকৃত মহিমা উন্মোচন করবে।

আমরা আশা করি, শহীদদের ও আল্লাহর বন্ধুদের সান্নিধ্যে থেকে আপনি এই জাতি এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের সব জাতির অগ্রগতির জন্য দোয়া করবেন।

হে শহীদ নেতা, আমরা আপনাকে অঙ্গীকার করছি—সত্যের পতাকাকে উঁচু রাখতে এবং আপনার পবিত্র লক্ষ্য পূরণে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাব।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আহত হলেও 'সুস্থ ও নিরাপদ' আছেন

শেষ কথা

আমার বক্তব্যের সপ্তম অংশে আমি ধন্যবাদ জানাই সকলকে—মহান ধর্মীয় নেতাদের, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এবং সেইসব মানুষকে যারা এসে আনুগত্য নবায়ন করেছেন।

আমি সরকারে তিনটি বিভাগের কর্মকর্তা এবং অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমি আশা করি এই পবিত্র দিনগুলোতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ইরানের জনগণ, বিশ্বের সব মুসলমান এবং নিপীড়িত মানুষের ওপর বর্ষিত হবে।

সবশেষে আমি প্রার্থনা করি, রমজানের এই শেষ দিনগুলোতে আল্লাহ আমাদের জাতিকে শত্রুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় দান করুন এবং সবার জন্য মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করুন।

আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।”