০৬:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস বাংলাদেশের, ৯ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয় পেনাল্টি মিসের হ্যাটট্রিক, মেসির মায়ামির টানা তৃতীয় হার ফিলিস্তিনিদের পানিতে বসতি স্থাপনকারীদের সুইমিংপুল, পশ্চিম তীরে নতুন ‘পানিযুদ্ধ’ ল্যাম্বরগিনির সবচেয়ে শক্তিশালী উৎপাদন গাড়ি, নতুন রেভুয়েলতো এসভি-তে গতি ও প্রযুক্তির বিস্ময় কাতারের হাতে ইরানি যুদ্ধবিমান চালকদের আটকের দাবি, সরাসরি অস্বীকার দোহার কূটনীতি নয়, রাজনৈতিক উসকানি তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল করলো ঢাকা আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মানচিত্র সীমান্তে ফের পুশইনের চেষ্টা, চারজনকে ঠেকিয়ে দিল বিজিবি ইউরোপের পোশাকবাজারে ধাক্কা, প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি কমল ১৬ শতাংশ

সারা দেশে হামের অ্যালার্ম: টিকার ঘাটতি, অবহেলা ও পুষ্টিহীনতায় ঝুঁকিতে শিশুরা

বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং পুষ্টিহীনতার কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।

দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ, বাড়ছে মৃত্যু

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে রাজধানীর বস্তি এলাকা ও উত্তরবঙ্গে হামের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এই রোগে।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৫৬০ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। যেখানে আগে পরীক্ষিত নমুনার মাত্র ১০ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া যেত, সেখানে এখন প্রায় ৯০ শতাংশই পজিটিভ আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হঠাৎ বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে সংক্রমণ ইতোমধ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

হামসহ ১০ রোগের টিকার সংকট

হামের লক্ষণ ও ঝুঁকি

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত শিশু ১০ থেকে ১৫ জন শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে।

এই রোগে সাধারণত প্রথমে জ্বর, সর্দি ও কাশি দেখা দেয়। এরপর মুখের ভেতরে ছোট দাগ, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে।

অনেক ক্ষেত্রে এটি সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে সেরে গেলেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি করে।

টিকার ঘাটতিই প্রধান কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদানে ঘাটতি।

একটি শিশুকে সাধারণত দুই ধাপে হামের টিকা দেওয়া হয়— প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। কিন্তু অনেক অভিভাবক প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে আগ্রহ দেখান না। এতে শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। করোনাকালীন সময়ের বিঘ্ন, পরবর্তী সময়ের অনিয়ম এবং ভুল ধারণা—সব মিলিয়ে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে হঠাৎ শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ - কেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে -  BBC News বাংলা

ক্যাচ-আপ টিকা বন্ধ, তৈরি হয়েছে ইমিউনিটি গ্যাপ

বিশ্ব স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর পর একটি অতিরিক্ত ‘ক্যাচ-আপ’ টিকা দেওয়া হয়, যা টিকা না পাওয়া শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

কিন্তু করোনা মহামারির সময় এই কর্মসূচি ব্যাহত হয় এবং পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়েও তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে পাঁচ থেকে ছয় বছরের একটি বড় ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সংক্রমণের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুষ্টিহীনতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকার ঘাটতি নয়, পুষ্টিহীনতাও হামের জটিলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ঢাকার বস্তি এলাকা ও উত্তরবঙ্গের শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বেশি হওয়ায় সেখানে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়া গেছে।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব, মার্চে ২১ শিশুর মৃত্যু, টিকায় ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন |  প্রথম আলো

সরকারের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

সরকার ইতোমধ্যে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং এজন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু উদ্যোগ নিলেই হবে না—টিকাদান নিশ্চিত করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং পুষ্টি উন্নয়ন একসঙ্গে না হলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

সামনে কী ঝুঁকি

যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে হামের সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে দেশের শিশুস্বাস্থ্য বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস বাংলাদেশের, ৯ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয়

সারা দেশে হামের অ্যালার্ম: টিকার ঘাটতি, অবহেলা ও পুষ্টিহীনতায় ঝুঁকিতে শিশুরা

১২:৫৯:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং পুষ্টিহীনতার কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।

দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ, বাড়ছে মৃত্যু

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে রাজধানীর বস্তি এলাকা ও উত্তরবঙ্গে হামের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এই রোগে।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৫৬০ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। যেখানে আগে পরীক্ষিত নমুনার মাত্র ১০ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া যেত, সেখানে এখন প্রায় ৯০ শতাংশই পজিটিভ আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হঠাৎ বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে সংক্রমণ ইতোমধ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

হামসহ ১০ রোগের টিকার সংকট

হামের লক্ষণ ও ঝুঁকি

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত শিশু ১০ থেকে ১৫ জন শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে।

এই রোগে সাধারণত প্রথমে জ্বর, সর্দি ও কাশি দেখা দেয়। এরপর মুখের ভেতরে ছোট দাগ, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে।

অনেক ক্ষেত্রে এটি সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে সেরে গেলেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি করে।

টিকার ঘাটতিই প্রধান কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদানে ঘাটতি।

একটি শিশুকে সাধারণত দুই ধাপে হামের টিকা দেওয়া হয়— প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। কিন্তু অনেক অভিভাবক প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে আগ্রহ দেখান না। এতে শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। করোনাকালীন সময়ের বিঘ্ন, পরবর্তী সময়ের অনিয়ম এবং ভুল ধারণা—সব মিলিয়ে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে হঠাৎ শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ - কেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে -  BBC News বাংলা

ক্যাচ-আপ টিকা বন্ধ, তৈরি হয়েছে ইমিউনিটি গ্যাপ

বিশ্ব স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর পর একটি অতিরিক্ত ‘ক্যাচ-আপ’ টিকা দেওয়া হয়, যা টিকা না পাওয়া শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

কিন্তু করোনা মহামারির সময় এই কর্মসূচি ব্যাহত হয় এবং পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়েও তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে পাঁচ থেকে ছয় বছরের একটি বড় ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সংক্রমণের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুষ্টিহীনতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকার ঘাটতি নয়, পুষ্টিহীনতাও হামের জটিলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ঢাকার বস্তি এলাকা ও উত্তরবঙ্গের শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা বেশি হওয়ায় সেখানে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়া গেছে।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব, মার্চে ২১ শিশুর মৃত্যু, টিকায় ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন |  প্রথম আলো

সরকারের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

সরকার ইতোমধ্যে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং এজন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু উদ্যোগ নিলেই হবে না—টিকাদান নিশ্চিত করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং পুষ্টি উন্নয়ন একসঙ্গে না হলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

সামনে কী ঝুঁকি

যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে হামের সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে দেশের শিশুস্বাস্থ্য বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।