কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে সফটওয়্যারে ব্যবধান কমালেও হার্ডওয়্যারে এখনও পিছিয়ে চীন। এই ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উন্নত চিপ পাচারের নতুন কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, যা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তুলছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চিপ পাচার
মার্চের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কৌঁসুলিরা এক বিস্ময়কর অভিযোগ আনেন। একটি প্রযুক্তি সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, এক কর্মী ও এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সার্ভার চীনে পাচার করেছেন। এসব সার্ভারে ছিল অত্যাধুনিক চিপ, যা সরাসরি বিক্রি নিষিদ্ধ। ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর তীব্রভাবে পড়ে যায়।

চিপে আধিপত্য, তবু ফাঁকফোকর
বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কম্পিউটিং শক্তির বিশাল অংশই নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি চিপের ওপর। দুই হাজার বাইশ সালের পর থেকে উন্নত চিপ সরাসরি চীনে বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলেও সন্দেহ থেকেই গেছে যে বিভিন্ন উপায়ে সেগুলো সেখানে পৌঁছে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির দাবি, এই ধরনের পাচার দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়, কারণ এসব যন্ত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক সেবা বা সহায়তা পাওয়া যায় না। তবু বাজারের চাহিদা এত বেশি যে ঝুঁকি নিয়েই চলছে এই অবৈধ বাণিজ্য।
জটিল সরবরাহ শৃঙ্খল, নিয়ন্ত্রণ কঠিন
এই কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল কতটা জটিল। একটি দেশের নকশা, অন্য দেশে উৎপাদন, তারপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংযোজন—শেষ পর্যন্ত ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে বহু স্তর অতিক্রম করতে হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সার্ভারগুলো পাঠানো হয়, পরে সেগুলো পুনরায় প্যাকেটজাত করে চীনে পৌঁছে দেওয়া হয়। এমনকি কাস্টমস কর্মকর্তাদের ধোঁকা দিতে গুদামে ভুয়া সার্ভারও রাখা হয়েছিল।

একক ঘটনা নয়, বাড়ছে প্রবণতা
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে একাধিকবার বড় আকারের চিপ পাচার চক্র ধরা পড়েছে। কখনও সরাসরি রপ্তানি, কখনও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ঘুরপথে সরবরাহ—সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। এছাড়া কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্লাউড সেবার মাধ্যমেও এই চিপ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
কড়া নীতির দাবি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
যুক্তরাষ্ট্রে এখন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার দাবি উঠেছে। কেউ কেউ চান উন্নত চিপে অবস্থান নির্ণয় প্রযুক্তি যুক্ত করা হোক, আবার কেউ চান বিক্রির আগে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হোক। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, এত বড় মুনাফার বাজারে এই ‘ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া’ কখনও শেষ হবে না। পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল বের করবেই।

নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট
সাম্প্রতিক এই কেলেঙ্কারি পরিষ্কার করে দিয়েছে, কেবল নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই প্রযুক্তির প্রবাহ থামানো যায় না। বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জটিলতা ও বিপুল আর্থিক প্রণোদনা মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিন দিন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















