১৯৪৪ সালের জাপানের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, ইরান প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং তার ইসলামিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করবে।
ইরানের ক্ষয়ক্ষতি যে বড় আকারের, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্থলসেনা মোতায়েন করা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে থাকলে, ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের কাছে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করেছিল, তখন আমার মনে পড়ে যায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের আগের জাপানের কথা।
তবে মনে পড়ে ১৯৪৫ সালের আগস্ট নয়, যখন জাপান পটসডাম ঘোষণা মেনে নিয়েছিল; বরং ১৯৪৪ সালের নভেম্বরের কথা, যখন টোকিওতে পূর্ণমাত্রায় বি-২৯ বোমা হামলা শুরু হয়েছিল। যদি এই কথাটি সত্য হয় যে “ইতিহাস নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না, তবে মাঝে মাঝে তার ছায়া ফিরে আসে”, তাহলে বলা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ইরান খুব সহজে আত্মসমর্পণ করবে না।

বর্তমান ইরান ও ১৯৪৪ সালের টোকিওর মধ্যে কিছু মিল রয়েছে, আবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অমিলও আছে। এর মধ্যে চারটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে।
প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদী জাপানের মতোই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক আক্রমণের বিরুদ্ধে এক ধরনের উগ্র ও অনমনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধপূর্ব জাপানের মতো ইরানেও একজন সর্বোচ্চ নেতা আছেন, যার ধর্মীয় কর্তৃত্ব রয়েছে এবং যিনি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কঠোর সামরিক গোষ্ঠী ও নীরব কিন্তু সহনশীল জনগণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তৃতীয়ত, টোকিওর মতোই ইরানের যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষা করা এবং শাসনব্যবস্থার পতন ঠেকানো। আর শেষত, পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হলেও তেহরান যুদ্ধকে যতটা সম্ভব বিলম্বিত করতে চাইছে, যেন সামান্য হলেও বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে তখনকার জাপান ও বর্তমান ইরানের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে।
প্রথম পার্থক্য হলো, ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল, কিন্তু এবার তা করতে পারবে না। ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অবস্থানের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সমালোচনা করে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে পার্ল হারবারে হামলার পর প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট ৭ ডিসেম্বরকে “কলঙ্কময় দিন” হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তৃতীয়ত, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী এই প্রেসিডেন্ট কোনো পেশাদার রাজনীতিবিদ বা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা নন; তিনি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, যার সামরিক কৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সীমিত।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধ শেষ হলে পরাজিত রাষ্ট্রের সঙ্গে কী করা হবে সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। এ কারণে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বেশি ব্যর্থতার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে হয়।
এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে যদি যুদ্ধবিরতি হয়ও, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে আবার সংঘর্ষ শুরু হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।
তীব্র প্রতিরোধ
যদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন, তাহলে ইসলামিক শাসনব্যবস্থা মরিয়া সংকল্প নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। মানুষের প্রাণহানির পরিমাণ যতই হোক, ধর্মীয় নেতারা তাতে বিচলিত হবেন না। এই যুদ্ধে যারা মারা যাবে, তাদের শহীদ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হবে। এই মূল্যবোধই ইরানকে ভেনেজুয়েলার মতো দেশ থেকে আলাদা করে। এ কারণেই আমি আগের এক লেখায় বলেছিলাম, “ইরানের কোনো মাদুরো নেই।”
ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সম্রাট হিরোহিতো সাম্রাজ্যিক রাজতন্ত্রের জাতীয় ব্যবস্থা রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কঠোর সামরিক গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাওয়া জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিকমুখী রাজনীতিবিদদের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন। তবু ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ঠেকাতে সম্রাট হিরোহিতোও ব্যর্থ হন।

একইভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি যদিও বেশি রক্ষণশীল ও কঠোর অবস্থানের নেতা, তবুও ইসলামিক প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হলে কিছু আপস করতে তিনি অনিচ্ছুক নন।
দীর্ঘ যুদ্ধেই ইরানের লাভ
তেহরানের বর্তমান কৌশল হলো যুদ্ধকে যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করা। প্রয়োজনে শেষ সৈন্য পর্যন্ত লড়াই করে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো না কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বাধ্য করা এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করা।
ক্ষয়যুদ্ধের এই কৌশল ইতিমধ্যেই কিছুটা ফল দিচ্ছে বলে মনে হয়। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৪৪ সালের নভেম্বরের জাপানের মতো, ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ের মতো নয়। ধারণা করা যায়, ইরানের ইসলামিক নেতারা বহু বছর ধরেই এমন একটি দিনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ যুদ্ধের কথা ভেবে অসংখ্য ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার তৈরি করেছিলেন।
ইরানের ক্ষয়ক্ষতি বড় হলেও যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থলসেনা পাঠাতে রাজনৈতিকভাবে অক্ষম থাকে, তাহলে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। এই সময়ে যদি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বহু মার্কিন সৈন্য বা নিরীহ ইরানি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ নিয়ে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়বে।
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ ছেড়ে দিয়েছেন এবং মনে হচ্ছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবেই সামরিক হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ইরানের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছেন এবং ধারণা করেছিলেন যে সংঘাত দ্রুত শেষ হবে।

কিন্তু তেহরান সম্ভবত যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার দিকেই এগোবে। যদি তারা যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে ইরানই লাভবান হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিজয় অর্জন করা কঠিন, কারণ মূলত তারা এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি বিজয় বলতে কী বোঝায়।
কোনো সশস্ত্র সংঘাতে জয়ী হতে হলে উদ্দেশ্য, উপায়, ন্যায়সঙ্গত কারণ এবং মিত্র—এই চারটি বিষয় দরকার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে যে সংঘাত শুরু করেছে, সেখানে তাদের হাতে আছে কেবল সামরিক শক্তির উপায়।
যদি ট্রাম্প প্রশাসনের কখনো জয়ের সুযোগ থেকে থাকে, তা ছিল জানুয়ারিতে—যখন ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জোরদার হচ্ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোকে সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু সেই সময় পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব দেখিয়ে নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব ট্রাম্পকে যুদ্ধ শুরু করতে দেরি করতে রাজি করায়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্তও জাপানের জাতীয় ব্যবস্থা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়নি। এবারও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে শাসনব্যবস্থা হিসেবে টিকে থাকতে দেবে—এমনটা কল্পনা করা কঠিন।

কিন্তু যদি এই সংঘাতে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সৈন্য নিহত হয়, ভুলবশত বিমান হামলায় অসংখ্য বেসামরিক মানুষ মারা যায়, অথবা গ্যাসের দামের অস্থিরতার কারণে বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
সেই পরিস্থিতিতে কোনো এক সময় ট্রাম্পকে অবশ্যই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে—এমন একটি অজুহাত, যা সামরিক অভিযানের ব্যর্থতাকে সম্মানজনক প্রত্যাহার হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
কুনি মিয়াকে 



















