ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পার হলেও তিনি এখন অস্বাভাবিকভাবে নীরব। যে সংঘাত তিনি জোরালোভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধ নিয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্য খুব কমই শোনা যাচ্ছে।
তিনি যখন কথা বলছেন, তখনও তা মূলত মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ইংরেজি ভাষার সাক্ষাৎকারে—যেমন ফক্স নিউজ—যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে পড়বে। অথচ একই সময়ে ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকরা প্রতিদিনের বড় একটি সময় কাটাচ্ছেন বিমান হামলার আশ্রয়কেন্দ্রে। ফলে নিজের দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে সরাসরি বক্তব্য না দেওয়ায় নেতানিয়াহুর এই আচরণ অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব রাজনৈতিক হিসাব।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ওয়াশিংটন
নেতানিয়াহু ভালোভাবেই জানেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ধারিত হবে তেল আবিবের সামরিক ঘাঁটিতে নয়, বরং হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তে। যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো এবং তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। কিন্তু এখন স্পষ্ট যে এই লক্ষ্য দ্রুত অর্জন করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আপাতত নীরব থাকাই নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে।

যুদ্ধ বিস্তারের কঠিন সিদ্ধান্ত
নেতানিয়াহুকে এখন আরেকটি বড় সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে—লেবাননে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না। এতে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ শুরু হতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েল কি তার সমস্ত সামরিক শক্তি শুধু ইরানের বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীভূত রাখবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ওয়াশিংটন ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নেতানিয়াহুর চাপের কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। এমনকি মার্কিন ডানপন্থী ভাষ্যকার টাকার কার্লসন তার এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, এই যুদ্ধ মূলত ইসরায়েলের ইচ্ছাতেই শুরু হয়েছে এবং এর সঙ্গে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও জুড়ে দেন।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলছেন।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত, ওয়াশিংটনের হিসাব
পর্যবেক্ষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন নেতা নন যিনি অন্য কারও নির্দেশে সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন, তবুও প্রয়োজনে তাকে প্রকাশ্যেই অগ্রাহ্য করতে দ্বিধা করেন না।

গত বছরের জুন মাসেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা নেতানিয়াহুর জন্য এক ধরনের অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক স্টিভেন সাইমনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধে অংশ নেয়, তবে তা হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় করেই নেওয়া সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত ভুলও হতে পারে বা ব্যয়বহুল প্রমাণিত হতে পারে, কিন্তু তা ওয়াশিংটনেই নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক লাভের হিসাব
নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। বহু বছর ধরে তিনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে একটি বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং এখন সেই সংঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের পাশে রয়েছে।
দেশের ভেতরেও তিনি ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছেন। বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ এই অভিযানকে “সবচেয়ে ন্যায্য সামরিক পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করেছেন। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেছেন, “ইরানের হুমকি শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো ইসরায়েল জাতি আপনার পাশে রয়েছে।”
অক্টোবরে সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচনের আগে এই সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে এই যুদ্ধ তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচার এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার জন্য তার সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ থেকেও জনমতকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

যুদ্ধের লক্ষ্য এখনো অধরা
তবে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী গত দুই সপ্তাহে ইতিহাসের অন্যতম বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেও সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা পতন—এখনো অনেক দূরের বিষয়।
এই পরিস্থিতিতে আরেকটি ঝুঁকিও রয়েছে। যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ এই যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে পুরো অভিযান ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং তার দায়ভার ইসরায়েলের ওপরই পড়তে পারে।
হিজবুল্লাহর নতুন হুমকি
এর মধ্যেই লেবানন থেকে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হলেও সংগঠনটির কিছু সামরিক কাঠামো এখনো সক্রিয় রয়েছে।
১১ মার্চ লেবানন থেকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোর দিকে প্রায় ২০০টি রকেট ও ড্রোন ছোড়া হয়, যা ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান ইসরায়েলকে লেবাননে আরেকটি স্থলযুদ্ধে টেনে আনতে চাইছে।
ইসরায়েল উদ্বিগ্ন যে হিজবুল্লাহর বিশেষ ইউনিট রাদওয়ান ফোর্স সীমান্তের কাছে মোতায়েন করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেলের মতে, “হিজবুল্লাহর মৃত্যু নিয়ে যে গুজব শোনা যায়, তা অতিরঞ্জিত। সংগঠনটি দুই বছর আগের তুলনায় দুর্বল হলেও এখনো সক্রিয় এবং হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।”
রিজার্ভ বাহিনী ও জনমতের চাপ
গত দুই সপ্তাহে ইসরায়েল প্রায় ৭০ হাজার রিজার্ভ সেনাকে ডেকে নিয়েছে। তবে এদের বেশিরভাগই বিমানবাহিনী ও সামরিক গোয়েন্দা ইউনিটে যুক্ত, যারা ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।
যদি লেবাননে স্থল অভিযান শুরু হয়, তবে আরও অনেক রিজার্ভ সেনাকে ডাকা লাগবে। কিন্তু এতে দেশের জনমনে অসন্তোষ বাড়তে পারে।
ইরানের ভেতরে চাপ তৈরি করার চেষ্টা
ইসরায়েল আশা করছে, ট্রাম্প যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ার আগেই ইরানের সরকারে অভ্যন্তরীণ ফাটল দেখা দেবে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই নিজেদের বিজয় দাবি করতে পারবে।

এই লক্ষ্যেই তেহরানের বিভিন্ন নিরাপত্তা চৌকিতে ড্রোন হামলা চালানো শুরু করেছে ইসরায়েল, যাতে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে তেহরানের আশপাশের তেল ডিপো ধ্বংস করার মতো কিছু হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি করছে এবং এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সামনে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি দুটিই রয়েছে। আর সেই কারণেই আপাতত তিনি নীরব থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাকেই সবচেয়ে নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















