চীনে নতুন একটি জাতিগত ঐক্য সংক্রান্ত আইন পাস হয়েছে, যা দেশটির সংখ্যালঘু নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীনা জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে একীভূত করার যে নীতি গত কয়েক বছরে জোরদার হয়েছে, এই আইন সেই নীতিকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য
চীনের জাতীয় সংসদ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে ১২ মার্চ “জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতি উন্নয়ন আইন” পাস করা হয়। এটি একটি মৌলিক আইন, যার আইনি গুরুত্ব সাধারণ আইনের চেয়ে বেশি। চীনের ফৌজদারি আইন ও দেওয়ানি বিধিও একই ধরনের মৌলিক আইনের অন্তর্ভুক্ত।
এই আইনের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে “যোগাযোগ, বিনিময় ও একীকরণ” বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান, পর্যটন এবং শিক্ষামূলক সফরের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে আইনটি আগের কিছু নীতিকে আইনি বৈধতা দিয়েছে। যেমন—প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের ম্যান্ডারিন ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা এবং বাধ্যতামূলক নয় বছরের শিক্ষা শেষ হওয়ার সময়, অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সে শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডারিন ভাষায় দক্ষ হওয়ার শর্ত।
শি জিনপিংয়ের নীতির প্রতিফলন
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বারবার বলেছেন যে জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে চীনা জাতীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইনটি মূলত শি জিনপিংয়ের অধীনে চীনের সংখ্যালঘু নীতির পরিবর্তনের একটি পরিণতি। এতে হান ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর চীনা জাতীয় পরিচয়কে জোরদার করা হয়েছে, আর সংখ্যালঘু সংস্কৃতির স্বতন্ত্র প্রকাশকে তুলনামূলকভাবে সীমিত করা হয়েছে।
তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই আইন কার্যত নতুন কোনো কঠোর পরিবর্তন আনছে না। বরং ইতোমধ্যে চালু থাকা নীতিগুলোকেই আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

চীনের জাতিগত বৈচিত্র্য
চীনে মোট ৫৬টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে হান চীনারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যারা দেশের মোট ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি।
অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর বেশিরভাগের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। চীনের সংবিধান অনুযায়ী সব জাতিগোষ্ঠী সমান মর্যাদার অধিকারী এবং যেসব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘনবসতিপূর্ণভাবে বসবাস করে, তাদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার রয়েছে।
এছাড়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু বিশেষ সুবিধাও রয়েছে, যেমন কমিউনিস্ট পার্টির নির্দিষ্ট পদে সংরক্ষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর।
নীতির পরিবর্তনের পটভূমি
অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস লাইবোল্ডের মতে, নতুন আইনটি চীনের জাতিগত নীতির দীর্ঘ পরিবর্তনের একটি আইনি সমাপ্তি। চীনা গবেষকদের ভাষায়, এটি প্রথম প্রজন্মের নীতি থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মের জাতিগত নীতিতে রূপান্তরের অংশ।
চীনের প্রাথমিক সমাজতান্ত্রিক যুগে মাও সেতুং বলেছিলেন, জাতিগত গোষ্ঠীগুলো যেন “নিজেদের ঘরের মালিক” হয়। তখন লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা।
কিন্তু ২০১০-এর দশকের শুরুতে কিছু চীনা গবেষক ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী মা রং যুক্তি দেন যে শক্তিশালী জাতিগত সচেতনতার পরিবর্তে চীনা জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করা উচিত। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার প্রস্তাবও উঠে আসে।

এই বিতর্কের পেছনে ছিল অস্থিরতা
এই আলোচনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ২০০০-এর দশকের শেষ এবং ২০১০-এর দশকের শুরুতে সংঘটিত জাতিগত সংঘর্ষ। বিশেষ করে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং তিব্বতের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে দাঙ্গা ও সহিংসতা ঘটে।
এই ঘটনাগুলো চীনের জাতিগত নীতি নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে বড় ধরনের আত্মসমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। সরকার এসব অস্থিরতার জন্য বিদেশ থেকে উসকানি পাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদকে দায়ী করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
তবে আন্তর্জাতিক মহলে এসব পদক্ষেপকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক দমন হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রভাব
অধ্যাপক লাইবোল্ড বলেন, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অনেক চিন্তাবিদ সতর্ক করে আসছেন যে জাতিগত ভিত্তিতে গড়ে ওঠা স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা রাষ্ট্রের ঐক্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে যেমন বিভিন্ন জাতিগত প্রজাতন্ত্র আলাদা হয়ে গিয়েছিল, তেমন আশঙ্কা চীনেও তৈরি হতে পারে—এই উদ্বেগ থেকেই নতুন নীতিগত পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগের মডেল থেকে সরে এসে নতুন একটি কাঠামো জোরদার করেন। এতে পার্টির শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণ এবং হান সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির সঙ্গে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর একীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইনটি মূলত সেই পরিবর্তিত নীতিকেই আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















