মধ্যপ্রাচ্যের ঝলমলে অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাই বহুদিন ধরে নিজেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শহরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দুবাই দুর্বল হলে সিঙ্গাপুর হয়তো বড় সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
দুবাই মেরিনায় ১১ মার্চ এক ব্যক্তি স্কুটার চালিয়ে যাচ্ছেন—এই শহরটি উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রবাহের কাছাকাছি অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার পুঁজি প্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের সুযোগ দেয়, যা সিঙ্গাপুর কিংবা হংকং সহজে অনুকরণ করতে পারে না।
দুবাইয়ের বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা মনে করিয়ে দেয় ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের হংকংকে। সে সময় শহরটি যুদ্ধের মুখে পড়েনি, কিন্তু সহিংস বিক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মহামারির অভিঘাতে তার অবস্থান নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। দূর থেকে নানা মন্তব্যে বলা হচ্ছিল, হংকং হয়তো আর বৈশ্বিক নগরী হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না।
এখন একই ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে দুবাইকে ঘিরে। গত দুই সপ্তাহে হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শহরের আকাশ পেরিয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বলছেন, দুবাইয়ের নিরাপদ আশ্রয়ের ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ছে।
পৃষ্ঠতলে এই আলোচনার কিছু ভিত্তি আছে বলেই মনে হয়। আর্থিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুবাইয়ে থাকা অতি ধনী অনেক বিনিয়োগকারী তাদের সম্পদ এবং নিজেদের দ্রুত অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। তাদের মতে, শহরটির প্রতি আস্থা নাকি গভীরভাবে নড়ে গেছে।
এমন মন্তব্য ছাড়াও বাস্তব উদ্বেগ স্পষ্ট। দুবাইয়ের মানুষ এখন নিরাপত্তা নিয়ে এমনভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, যা আগে কখনও করতে হয়নি। শহরে যাতায়াত এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ভ্রমণও এখন অনিশ্চয়তায় ভরা। পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন আর কেবল তাত্ত্বিক মনে হচ্ছে না।
অবশ্য কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে অন্য এক মনোভাব থেকেও—যাকে বলা যায় অন্যের দুর্দশায় আনন্দ পাওয়া। অনেকের চোখে দুবাই ছিল ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কর ফাঁকির আশ্রয়স্থল। ফলে তাদের বিপাকে পড়তে দেখে কেউ কেউ তৃপ্তি পাচ্ছেন।
তবু এই আলোচনার একটি দিক বিশেষভাবে বিস্ময়কর, বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের দৃষ্টিকোণ থেকে। তা হলো এই ধারণা যে, দুবাই দুর্বল হলে সিঙ্গাপুরই হবে বড় বিজয়ী।
এই ধরনের ধারণা নতুন নয়। হংকংয়ের সমস্যার সময়ও এমনই কথা শোনা গিয়েছিল। তখন বলা হচ্ছিল, সিঙ্গাপুরই নাকি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক শহরের শেষ আশ্রয়স্থল—একটি নিরাপদ বন্দর, যা পশ্চিমা শহরের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা চীনের শাসনের অনিশ্চয়তা—কোনোটিরই শিকার নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তি আরও এগিয়ে যায়। অনেকেই মনে করেন, সিঙ্গাপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য এমন যে, যেকোনো সংঘাতের সময় এটি স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে।
এই ধারণা আকর্ষণীয়। বিদেশে থাকা সিঙ্গাপুরপ্রেমী কিংবা সিঙ্গাপুরের মানুষ নিজেরাও কখনও কখনও এই বিশ্বাসে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।
বাস্তবে বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোকে এভাবে সহজভাবে দেখা ভুল। সিঙ্গাপুর, হংকং কিংবা দুবাই—কোনোটিই রাতারাতি তৈরি হয়নি। ফলে সামান্য সমস্যায় কোনো শহর হঠাৎ ধ্বংস হয়ে যায় না, আবার একটি শহর দুর্বল হলেই অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভবান হবে—এমনটাও নয়।
অনেকে ভাবেন, দুবাইয়ের বাসিন্দারা সহজেই সিঙ্গাপুরে চলে যেতে পারেন, যেন এটি আরও উন্নত নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু এই ধারণা দুই শহরের বাস্তব শক্তি ও দুর্বলতাকে ভুলভাবে বোঝার ফল।
দুবাই সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, শহরটির সামাজিক কাঠামো দুর্বল, কারণ সেখানে অভিবাসীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান প্রতিবেদক ইয়ারোস্লাভ ট্রোফিমভ, যিনি এক দশক ধরে দুবাইয়ে বাস করছেন, গত সপ্তাহে লিখেছেন যে শহরটি দ্রুতই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।
হামলার পঞ্চম দিনেই শহরের অনেকটা স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। প্রধান সড়কে আবার যানজট দেখা যায়, অফিস, শপিং মল ও রেস্তোরাঁগুলো ভরে ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র, অক্ষতই ছিল।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রেও একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে—যে শহরটির মধ্যে যেন কোনো স্বাভাবিক দুর্বলতা নেই। সত্যিই সিঙ্গাপুরের সরকার দক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য পরিচিত। কিন্তু তাই বলে কি পানি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো ঝুঁকি থেকে দেশটি সম্পূর্ণ মুক্ত?
বাস্তবে সিঙ্গাপুরও অনেক উপসাগরীয় দেশের মতো ক্রমেই সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে বাহরাইন ৯ মার্চ জানিয়েছে, একটি ইরানি ড্রোন তাদের একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় আঘাত করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে—এ ধরনের ঘটনা কি অন্য কোথাও ঘটতে পারে না?

অনেকে মনে করেন, ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে সিঙ্গাপুর তুলনামূলক নিরাপদ। দুবাইয়ের পাম জুমেইরার বিলাসবহুল এলাকায় যেমন বাসিন্দারা আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র দেখতে পেয়েছেন, সিঙ্গাপুরে মেরিনা বে বা সেন্টোসা কোভের বাসিন্দাদের তেমন দৃশ্য দেখার সম্ভাবনা খুবই কম।
তবে এই আত্মবিশ্বাসের মধ্যেও হয়তো একটি ঝুঁকি আছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি সবসময়ই স্থির থাকবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
আরও একটি বড় কারণ আছে, যার জন্য দুবাইয়ের সমস্যাকে সিঙ্গাপুরের সুযোগ হিসেবে দেখা খুবই সরলীকৃত ধারণা। বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই একে অপরের বিকল্প হয়ে ওঠে।
হংকংয়ের সংকটের সময়ও অনেকেই বলেছিলেন, সিঙ্গাপুর দ্রুত তার জায়গা দখল করবে। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল, বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইপিও বাজার ছিল হংকং। বিশেষ করে চীনা কোম্পানির জন্য মূলধন সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে শহরটির অবস্থান অটুটই ছিল।
এই বাস্তবতা দেখায়, এক শহর আরেকটির সরাসরি বিকল্প নয়। ব্লুমবার্গের কলাম লেখক শুলি রেন ২০২৪ সালে লিখেছিলেন, হংকং ও সিঙ্গাপুরকে তুলনা করা অনেকটা আপেল ও কমলালেবুর তুলনার মতো।
চীনের নিকটবর্তী হওয়ায় হংকং মূলধন বাজার এবং চীন-সংযুক্ত বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে, যদিও তারা নিজেদের মূলধন বাজারও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
ভাভান জয়প্রাগাস 



















