ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ যদি প্রত্যাশামতো ফল না দেয়, তাহলে দায় কার ঘাড়ে পড়বে—এই প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ঘরানা নিজেদের নেতাকে দায়মুক্ত রাখতে অন্য কোনো পক্ষকে দোষারোপের পথ খুঁজতে পারে। সেই আলোচনায় ক্রমেই সামনে আসছে ইসরায়েলের ভূমিকা।
ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ও নতুন সন্দেহ
দুই দশক আগে ইরাক যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের বিতর্ক দেখা গিয়েছিল। সে সময় ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে সাদ্দাম হোসেনের সরকার অপসারণের পক্ষে মত দেন। পরে যখন যুদ্ধ সামরিক সাফল্য থেকে কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়, তখন অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তবে তখন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সে সময় ইসরায়েলের নেতৃত্বে ছিলেন আরিয়েল শ্যারন, যিনি ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাক আক্রমণ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল কার্টজার পরে জানান, ইসরায়েলের অনেক কর্মকর্তাই তখন বলেছিলেন—যদি যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করে, তবে দ্রুত সরে যাওয়া উচিত এবং ইরাককে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

ইরান যুদ্ধের বাস্তবতা
বর্তমান ইরান যুদ্ধের চিত্র অনেক বেশি জটিল। দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার বিরোধিতা করে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অতীতের উপসাগরীয় যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সরাসরি যুদ্ধে না টানার চেষ্টা করেছিল, কারণ এতে আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া বাড়তে পারত। কিন্তু এবার দুই দেশের সেনাবাহিনী কার্যত একসঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একসময় মন্তব্য করেন, হামলার সময় নির্ধারণে ইসরায়েলের প্রভাব ছিল। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তা অস্বীকার করে বলেন, বরং তিনিই ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
ইরাক যুদ্ধের পর যে সন্দেহ ধীরে ধীরে একাডেমিক মহল থেকে রাজনীতিতে ঢুকেছিল, এবার তা দ্রুত জনপ্রিয় আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে। টেলিভিশনের ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠানগুলোতেও এই বিষয় নিয়ে কৌতুক করা হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প যুদ্ধের অনুমোদন পেয়েছেন—কারণ নেতানিয়াহু তা মেনে নিয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট দলের কয়েকজন সিনেটর অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প মূলত ইসরায়েলের পথ অনুসরণ করছেন। একই ধরনের মন্তব্য শোনা যাচ্ছে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক ঘরানা থেকেও। ডানপন্থী ভাষ্যকার টাকার কার্লসন এই সংঘাতকে সরাসরি “ইসরায়েলের যুদ্ধ” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সিদ্ধান্তের দায় কার?
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যাখ্যা আংশিক সত্য হলেও পুরো বাস্তবতা নয়। নেতানিয়াহু সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো মত দিলেও শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতেই। ট্রাম্প চাইলে সেই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন।
উল্টো দিকে দেখা গেছে, প্রয়োজন হলে ট্রাম্প ইসরায়েলের ওপর চাপও প্রয়োগ করেছেন। ইরানের সঙ্গে বারো দিনের সংঘাতের শেষে তিনি ইসরায়েলকে বোমারু বিমান ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন। আবার ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি করার সময়ও তিনি ইসরায়েলের স্বার্থ পুরোপুরি বিবেচনায় নেননি।
কেন এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র?
তবে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—ট্রাম্প কেন এই যুদ্ধে যুক্ত হলেন। কয়েক মাস আগেও তার জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দায়িত্ব ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছিল। অথচ এবার তিনি সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
কিছু পর্যবেক্ষকের ধারণা, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় দ্রুত সাফল্যের পুনরাবৃত্তি চাইছিলেন ট্রাম্প। সেই বিজয়ের অংশীদার হওয়ার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাও তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজনৈতিক মিত্রতার ঝুঁকি
ইসরায়েলের জন্যও এই জোট ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থন বজায় রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। কিন্তু নেতানিয়াহু যখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একপক্ষীয় অবস্থান নিতে শুরু করেন, তখন সেই ভারসাম্য দুর্বল হতে থাকে।
গাজা যুদ্ধের কঠোর নীতি অনেক ডেমোক্র্যাট রাজনীতিককে ইসরায়েল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যেও ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা কমানোর পক্ষে মত বাড়ছে।

দায় এড়ানোর নতুন রাজনীতি
বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকেরা তাকে রাজনৈতিকভাবে দায়ী করতে চাইবেন না। ফলে যুদ্ধের ফল যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে নতুন করে দোষারোপের রাজনীতি শুরু হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল বা অন্য কোনো মিত্র দেশকে দায়ী করার প্রবণতা আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত তাই শুধু সামরিক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















