ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে ইসরায়েল ও আমেরিকার লক্ষ্য যে পুরোপুরি এক নয়—সেই বাস্তবতা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধের শুরুতে দুই দেশ একই অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হলেও সময়ের সঙ্গে কৌশলগত পার্থক্য সামনে আসছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য যেখানে ইরানের ক্ষমতাসীন ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া, সেখানে আমেরিকার দৃষ্টি বেশি কেন্দ্রীভূত তেলের সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের দিকে।
যুদ্ধের মাঝেই সামরিক বার্তা
৬ মার্চ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল তোমের বার নিজেই একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান উড়িয়ে ইরানে হামলা চালানোর অভিযানে অংশ নেন। সাধারণত জেনারেলরা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যান না। তাই এই পদক্ষেপকে অনেকেই প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখছেন।
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এটি কেবল প্রদর্শন নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, আর সেই প্রস্তুতির প্রতিফলনই দেখা গেছে এই অভিযানে।

নেতানিয়াহুর লক্ষ্য: শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের লক্ষ্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে ইরানের জনগণ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
তার ধারণা, বর্তমান সংঘাত ইরানের ভেতরে শাসনবিরোধী আন্দোলনের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সহজ নয়।

আমেরিকার ভিন্ন অগ্রাধিকার
আমেরিকার অবস্থান কিছুটা আলাদা বলেই মনে করছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পুরো শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়ার চেয়ে ভেতর থেকে আরও সহযোগিতাপূর্ণ কোনো নেতৃত্বের উত্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানের তেল। ইরানের তেলের বড় ক্রেতা চীন, যারা ছাড়মূল্যে তেল কিনে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাকে অনেক সময় উপেক্ষা করে। মার্চের শেষ দিকে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে ইরানের জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে চীনের সঙ্গে কৌশলগত দরকষাকষিতে আমেরিকা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।

তেহরানে হামলা নিয়ে উত্তেজনা
৭ মার্চ তেহরানে জ্বালানি ট্যাংকে বড় হামলার পর দুই মিত্রের মধ্যে প্রথম অস্বস্তি প্রকাশ্যে আসে। আমেরিকান কর্মকর্তারা এই হামলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এতে ইসরায়েল বুঝতে পারে, ওয়াশিংটনের মূল অগ্রাধিকার হয়তো অন্য জায়গায়।
ইরানের ভেতরে বিদ্রোহের সম্ভাবনা
যুদ্ধ চলার সময় ইরানে সরকারবিরোধী বড় আন্দোলনের সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অতীতে বিক্ষোভকারীরা সাহসিকতা দেখালেও এখন বোমা হামলার মধ্যে রাস্তায় নামা তাদের পক্ষে কঠিন।
তার ওপর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে শাসনবিরোধী বিদ্রোহের সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যাবে।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সমীকরণ
এই যুদ্ধের সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গভীরভাবে জড়িত। এ বছরই নেতানিয়াহুকে কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তাই তিনি অসম্পূর্ণ ফলাফল নিয়ে যুদ্ধ শেষ করতে চান না।
গত বছরের জুনে ইরানের সঙ্গে আগের সংঘাতের পর তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো দুইটি বড় হুমকি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাত্র আট মাসের মধ্যেই আবার ইসরায়েলের ওপর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়েছে।
যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনই বিজয়ের দাবি তুলতে পারেন। তবে সেই দাবিতে তাদের ভোটাররা কতটা সন্তুষ্ট হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















