আমেরিকার রাজনীতিতে যুদ্ধ অনেক সময় প্রেসিডেন্টদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে একাধিকবার। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকার জনমত বিভক্ত হলেও তার সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি ম্যাগা সমর্থকদের মধ্যে এখনো দৃঢ় সমর্থন দেখা যাচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরুর পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের উল্লম্ফন না হলেও রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থন কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে নিজেদের ম্যাগা সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়া রিপাবলিকানদের মধ্যে এই সমর্থন সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে আন্দোলন দীর্ঘদিন বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারা কেন এখন ট্রাম্পের যুদ্ধকে সমর্থন করছে?
ট্রাম্পকেন্দ্রিক আন্দোলনের বাস্তবতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাগা আন্দোলন মূলত নীতির চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এক রাজনৈতিক শক্তি। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। ফলে তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা অনেক সমর্থকের কাছে প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্প নিজেও বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই আন্দোলন মূলত তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। তার মতে, ম্যাগা মানেই ট্রাম্প। ফলে তার যেকোনো পদক্ষেপকে সমর্থনের প্রবণতা এই আন্দোলনের ভেতরে শক্তভাবেই কাজ করে।
শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি
ট্রাম্পের সামরিক কৌশলও তার সমর্থকদের কাছে আকর্ষণীয়। তিনি প্রায়ই দ্রুত ও নাটকীয় সামরিক পদক্ষেপে বিশ্বাস করেন, যেখানে লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে সরাসরি আঘাত করা।
এর আগে ভেনেজুয়েলায় অভিযানের সময় বিশেষ বাহিনীর আকস্মিক হামলার মাধ্যমে দেশটির নেতৃত্বকে অপসারণের ঘটনা তার সমর্থকদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস তৈরি করেছিল। একই ধরনের ভাষা ও কৌশল ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের সমর্থকরা এটিকে শক্তিশালী আমেরিকার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন
এই যুদ্ধের আরেকটি দিক হলো ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। আন্তর্জাতিক আইন বা কূটনৈতিক নিয়মের প্রতি তার অনীহা বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তার প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রচলিত নিয়মের বাধ্যবাধকতা খুব একটা মানা হয়নি।

তবে ট্রাম্পের অবস্থান সবসময় এক জায়গায় স্থির—আমেরিকার স্বার্থ আগে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকেও আমেরিকার লাভ হওয়া উচিত বলে তিনি বহুবার দাবি করেছেন। যদিও বাস্তবে ইরানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে আমেরিকার ভোক্তাদের ওপরও।
দ্রুত যুদ্ধের কৌশল
ট্রাম্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা। তার প্রশাসন একাধিক দেশে বিমান বা নৌ হামলা চালালেও সেগুলো সাধারণত সীমিত সময়ের জন্য পরিচালিত হয়েছে।
ম্যাগা সমর্থকদের অনেকেই মনে করেন, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে মূল সমস্যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি সেনা মোতায়েন এবং বিদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ট্রাম্প সেই পথে হাঁটতে চান না বলেই তারা বিশ্বাস করেন। ফলে অনেক সমর্থক ধারণা করছেন, ইরান সংঘাতও দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে না।
ভেতরের অস্বস্তি
তবে ম্যাগা শিবিরের সবাই যে সন্তুষ্ট, এমন নয়। কিছু সমর্থক মনে করছেন এই যুদ্ধ ট্রাম্পের আগের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি একসময় বলেছিলেন, আমেরিকাকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন এবং দেশের ভেতরের সমস্যায় বেশি গুরুত্ব দেবেন।
আরেকটি বড় উদ্বেগ জ্বালানি বাজার নিয়ে। তেলের দাম বেড়ে গেলে তা সরাসরি সাধারণ ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরতলির এলাকাগুলোতে যেখানে বড় গাড়ির ব্যবহার বেশি।
সামনে বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি দ্রুত শেষ হয় তাহলে ট্রাম্পের সমর্থনভিত্তি সম্ভবত অটুট থাকবে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মতো কঠিন লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে স্থল সেনা পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। সেটি ঘটলে ম্যাগা সমর্থকদের মধ্যে নতুন বিতর্ক শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবু আপাতত ট্রাম্পের প্রতি তাদের আস্থা অটুট। বহু বিতর্ক ও সমালোচনার পরও ম্যাগা আন্দোলনের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে ইরান যুদ্ধই হয়তো শেষ পর্যন্ত সেই সমর্থনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















