ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অনেক ইরানি প্রবাসীর মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। কেউ মনে করছেন এখনই শাসনব্যবস্থার পতনের সুযোগ এসেছে, আবার কেউ বলছেন দীর্ঘ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
খামেনির মৃত্যুর খবর শুনে উচ্ছ্বাস
লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্টউড এলাকায় নিজের গ্রিক খাবারের দোকানে ছিলেন রুজবেহ ফারাহানিপুর, যখন তিনি প্রথম শুনলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হয়েছেন। শুরুতে তিনি খবরটি বিশ্বাস করতে পারেননি।
১৯৯৯ সালে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার পর তিনি ইরান ছেড়ে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। বহু বছর ধরে তিনি আশা করেছিলেন একদিন দেশের সর্বোচ্চ নেতার পতন ঘটবে।
খবরটি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি শ্যাম্পেনের বোতল খুলে উদ্যাপন শুরু করেন। আশপাশে জড়ো হওয়া মানুষজন ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। কেউ তাকে অভিনন্দন জানাতে এলে তিনি তাদেরও শ্যাম্পেন ঢেলে দেন।

‘তেহরানজেলেস’: প্রবাসী ইরানিদের বড় কেন্দ্র
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইরানি বংশোদ্ভূতদের প্রায় অর্ধেকই ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ ত্রিশ হাজার মানুষ লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে বাস করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর অনেক ইরানি, বিশেষ করে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ, দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। তাদের অনেকেই ধনী ও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। তারা ওয়েস্টউড ও বেভারলি হিলস এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন, যা পরে ‘তেহরানজেলেস’ নামে পরিচিত হয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা শুরু করার পর ওয়েস্টউড বুলেভার্ড আবারও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এক রেস্তোরাঁর সামনে দেখা যায় “ইরানকে আবার মহান করো” লেখা স্লোগান। একটি পার্সিয়ান বইয়ের দোকানে টাঙানো রয়েছে ইরানের সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভির ছবি। তার পাশে ঝুলছে পোস্টার—ইরানে শাসন পরিবর্তন চাই, আর কোনো আয়াতুল্লাহ নয়।
শাসন পরিবর্তনের প্রশ্নে বিভক্ত মত
অনেক ইরানি প্রবাসী শাসন পরিবর্তনের আশা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
বেভারলি হিলসের ব্যবসায়ী ও কর্মী এলহাম ইয়াগুবিয়ান মনে করেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার সময় নয়। তার মতে, ইরানের ক্ষমতাধর নিরাপত্তা বাহিনী বিপ্লবী গার্ড দুর্বল না হওয়া পর্যন্ত চাপ অব্যাহত রাখা উচিত। তিনি বলেন, এই সময়ে ইরানের জনগণকে একা ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না।

তবে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু রুজবেহ ফারাহানিপুর ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার মতে, খামেনির মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বিজয় ঘোষণা করে সংঘাত থেকে সরে দাঁড়াতে পারত। তিনি চান বোমা হামলা বন্ধ হোক, যাতে ইরানের মানুষ রাস্তায় নেমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারে।
তবে উভয় পক্ষই একটি বিষয়ে একমত। তারা চান না এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক যেখানে বিদেশি সমর্থনে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আরেক সদস্যকে বসিয়ে দেওয়া হবে। তাদের মতে, যাদের হাতে জনগণের রক্ত লেগে আছে তারা দেশের নেতৃত্বে থাকার অধিকার রাখে না।
নতুন প্রজন্মের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের প্রতি সমর্থন কমে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কারণ প্রবাসী ইরানিদের অনেক তরুণ এখন ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠায়। তাদের রাজনৈতিক স্মৃতিতে ইরানের শাসনব্যবস্থার চেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমান আগ্রাসী নীতি শেষ পর্যন্ত মুক্তি নয়, বরং দীর্ঘ সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ওয়েস্টউড বুলেভার্ডের দেয়ালে ইতিমধ্যে যুদ্ধবিরোধী বার্তাও দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারিতে নিহত বিক্ষোভকারীদের ছবির ওপর লাল রঙে লেখা হয়েছে—যুদ্ধ বন্ধ করো।
শোকের মাঝেও আশার সুর
৮ মার্চ নওরোজ বা পার্সিয়ান নববর্ষ উপলক্ষে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জড়ো হন তেহরানজেলেসের বাসিন্দারা।
সেখানে ইরানশাহর অর্কেস্ট্রা নিহত বিক্ষোভকারীদের স্মরণে একটি শোকসংগীত পরিবেশন করে। সুরকার শাহাব পারাঞ্জ উপস্থিতদের উদ্দেশে বলেন, আমরা দুঃখ অনুভব করছি, উদ্বেগ ভাগাভাগি করছি, কিন্তু তবুও আশাকে ধরে রাখছি।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















