মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েমের বিদায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্ত্রিসভা থেকে তাকে অপসারণ করার মাত্র দুই দিন পরই নোয়েম নতুন এক কূটনৈতিক দায়িত্বে যোগ দেন। তবে সেই পদটি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ এটি প্রেসিডেন্টের তৈরি একটি নতুন পদ বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেন।
লাতিন আমেরিকার নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে নোয়েম প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাওয়া তার জন্য সম্মানের। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ‘আমেরিকাস শিল্ড’ নামে একটি নতুন জোটের প্রথম সম্মেলনে, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধের ডানপন্থী দেশগুলোকে একত্র করার চেষ্টা চলছে।
বিতর্কের মধ্যে বিদায়
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই নোয়েমের পদত্যাগ নিয়ে ওয়াশিংটনে জল্পনা চলছিল। মিনিয়াপোলিসে চলতি বছরের শুরুর দিকে অভিবাসন সংক্রান্ত অভিযানের সময় দুই মার্কিন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ঘটনার পর রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সিনেটররা তার পদত্যাগ দাবি করেন এবং কংগ্রেসে তাকে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়।

শেষ পর্যন্ত ৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ বার্তা দিয়ে তাকে বরখাস্ত করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে নতুন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা মন্ত্রী হিসেবে ওকলাহোমার সিনেটর মার্কওয়েইন মুলিনের নাম ঘোষণা করা হয়।
অভিবাসন নীতির কঠোর মুখ
দক্ষিণ ডাকোটার সাবেক গভর্নর নোয়েম আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই দপ্তরের দায়িত্ব নেন। তবে তার নেতৃত্বে দপ্তরটি দ্রুত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক শক্তিশালী কাঠামোতে রূপ নেয়। কংগ্রেসও এই উদ্যোগে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয়, যার বড় অংশই যায় অভিবাসন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে।
নোয়েম নিজেকে প্রেসিডেন্টের গণবহিষ্কার অভিযানের মুখ হিসেবে তুলে ধরেন। দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে ছবি তোলা কিংবা আটক ব্যক্তিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও বার্তা দেওয়ার মতো পদক্ষেপও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। মিনিয়াপোলিসে নিহত এক বিক্ষোভকারীর ঘটনা তদন্ত শুরুর আগেই তিনি সেটিকে ‘দেশীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দেন, যা বিতর্ককে আরও তীব্র করে।
বিজ্ঞাপন চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
তবে শেষ পর্যন্ত তার পদচ্যুতির পেছনে অন্য একটি বিষয় বড় ভূমিকা রাখে। কংগ্রেসে শুনানির সময় ২২ কোটি ডলারের একটি প্রচারণা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একটি বিজ্ঞাপনে নোয়েমকে মাউন্ট রাশমোরের সামনে ঘোড়ায় চড়ে বলতে দেখা যায়— যারা আইন ভাঙবে, তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।

নোয়েম দাবি করেন, এই প্রচারণায় প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সেই দাবি অস্বীকার করলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এবং কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নেন।
ভেতরেও ছিল অস্বস্তি
নোয়েমের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দপ্তরে নতুন করে বিপুলসংখ্যক অভিবাসন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দ্রুত প্রশিক্ষণ দিয়ে শহরগুলোতে তাদের পাঠানোয় অনেকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত ছিলেন না বলে অভিযোগ ওঠে। মিনিয়াপোলিসের ঘটনাও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন বলে মনে করেন সমালোচকরা।
দপ্তরের ভেতরেও তার জনপ্রিয়তা কম ছিল। গত এক বছরে যারা পদ ছেড়েছেন, তাদের অনেকে দাবি করেন দপ্তরের ভেতরে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। নোয়েমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কোরি লেভানডোস্কির ভূমিকা নিয়েও তখন নানা অভিযোগ ওঠে।
নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম
নোয়েমের বিদায়ের পর দপ্তরটি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। নতুন অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অভিবাসন সংস্থার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি তুলেছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম।
নতুন মন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিন দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অভিবাসন নীতির সমর্থক। তাছাড়া হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান স্টিফেন মিলার এখনও সীমান্ত ও বহিষ্কার নীতির প্রধান স্থপতি হিসেবে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। ফলে প্রশাসনের অভিবাসন নীতির মূল দিকগুলো আগের মতোই থাকার ইঙ্গিত মিলছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















