লেবাননের মানুষ ক্লান্ত। বারবার ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো, মাসের পর মাস অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস, রাতদিন বিস্ফোরণের শব্দ—সব মিলিয়ে যুদ্ধ যেন তাদের জীবনকে অবসাদে ভরিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোতে বোমা হামলা, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বসতি আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এখন অনেক লেবাননের মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
মাত্র দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে দেশটি। আর সেই পরিস্থিতিতে বহু মানুষ প্রথমবারের মতো প্রশ্ন তুলছেন হিজবুল্লাহর সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা নিয়ে।
ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানোর ক্লান্তি
দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা লেইলা সাফা গত দেড় বছরে দুইবার ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। তার কথায়, মানুষ এখন শুধু শান্তিতে বাঁচতে চায়।
সীমান্তের কাছে বসবাসকারী কৃষক হাসান কুয়াইক বলেন, আগের সংঘর্ষে তার বাড়ি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখন আবারও আশঙ্কা করছেন সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
বৈরুতের সমুদ্রতীরে বসে থাকা এক নারী জানান, দক্ষিণ উপশহর থেকে পালিয়ে আগের রাতটি তাকে খোলা আকাশের নিচে কাটাতে হয়েছে। তার ভাষায়, ক্লান্তি শব্দটি দিয়ে পরিস্থিতি বোঝানো যায় না—মানুষ এখন তারও বাইরে চলে গেছে।
দ্বিতীয় বড় যুদ্ধে লেবানন
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে লেবানন আবারও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। দুই সপ্তাহের লড়াইয়ে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আট লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই লাখেরও বেশি শিশু রয়েছে।
অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল ভবন কিংবা খোলা জায়গায় হাজার হাজার পরিবার এখন আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই দিন কাটাচ্ছেন তাঁবুতে কিংবা ভাঙা বাড়ির পাশে অস্থায়ী বাসস্থানে।

হিজবুল্লাহর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
অনেক লেবাননির মতে, এই যুদ্ধের মূল সংঘাত ছিল অন্য দেশের মধ্যে। কিন্তু তবুও হিজবুল্লাহ এতে জড়িয়ে পড়েছে।
বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা এক নারী বলেন, যদি এটি অন্য দেশের যুদ্ধ হয়, তাহলে কেন তাদের দেশ এতে জড়াবে। তার মতে, সেই সিদ্ধান্তের মূল্য এখন লেবাননের মানুষকেই দিতে হচ্ছে।
অনেক সমর্থকের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। আগের সংঘর্ষে বিপুল ধ্বংসের পর পুনর্গঠনে প্রত্যাশিত সহায়তা না পাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধের পর আর্থিক সহায়তা খুবই সীমিত ছিল, ফলে অনেককে নিজেদের সঞ্চয় খরচ করেই ঘরবাড়ি মেরামত করতে হয়েছে।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
লেবাননের সরকারও এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার বলছে, দেশকে আর অন্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সম্প্রতি এক ভাষণে বলেন, লেবাননকে আবারও অন্যদের সংঘাতের মঞ্চে পরিণত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বক্তব্য কিছু মানুষের মধ্যে সমর্থনও পেয়েছে। অনেকেই বলছেন, এখন রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিভক্ত সমাজে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
তবে বাস্তবতা জটিল। লেবাননের সমাজ ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘ ইতিহাসের দ্বন্দ্ব রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহ এখনও শিয়া সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত। তাই কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, সংগঠনটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়লে তার প্রভাব পুরো সম্প্রদায়ের ওপর পড়তে পারে।
ফলে যুদ্ধের ক্লান্তি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ—সব মিলিয়ে লেবাননের মানুষের সামনে এখন এক গভীর সংকটের সময় দাঁড়িয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















