ইরানের আকাশে জ্বলতে থাকা তেলের ডিপো থেকে ওঠা বিশাল আগুন ও কালো ধোঁয়া সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যেন এক অশনি সংকেত হয়ে উঠেছে। রাজধানী তেহরানের আকাশ ঢেকে যায় ধোঁয়ায়, আর সেই আঘাতের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় ওয়াশিংটন পর্যন্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে আঘাত হানলেও, তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য যে এক নয়—তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে দুই নেতার ভিন্ন হিসাব
বর্তমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর লক্ষ্য নিয়ে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য এবং সে লক্ষ্য প্রায় পূরণ হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের নেতৃত্ব মনে করছে, শুধু সামরিক শক্তি দুর্বল করাই যথেষ্ট নয়। তারা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে চায়। সহজভাবে বললে, ট্রাম্প চান ইরানকে নত করতে, আর নেতানিয়াহু চান পুরো ব্যবস্থাকেই ভেঙে দিতে।
তেলের আগুনে কাঁপছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার
তেহরানে তেলের ডিপোতে হামলার পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বহু দেশ অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা করছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে একাধিক জাহাজ হামলার শিকার হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলপথে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে, কারণ যুদ্ধ নিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের সমর্থন খুব শক্তিশালী নয়।

সামরিক সমন্বয় থাকলেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ফাঁক
যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এখনো যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, পারমাণবিক অবকাঠামো, নৌবাহিনী, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং সামরিক নেতৃত্ব কাঠামো—এসব ধ্বংস করাই তাদের তাত্ক্ষণিক লক্ষ্য।
তবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে মতভেদ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি নিয়ন্ত্রিত ও সমঝোতামূলক সরকার চায়, কিন্তু ইসরায়েল চায় সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই পার্থক্য ভবিষ্যতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুদ্ধ বাড়লে আশঙ্কা দীর্ঘ সংঘাতের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নেতৃত্ব বলছে, বর্তমান অভিযান অতীতের দীর্ঘ যুদ্ধের মতো নয়। তাদের দাবি, এটি সীমিত লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান।
তবে বাস্তবতা ইতিমধ্যে কঠিন হয়ে উঠছে। চলমান অভিযানে ইতোমধ্যে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত এবং অনেক আহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
রাজনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রে জনমতও এই সংঘাত নিয়ে বিভক্ত। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন তুলনামূলকভাবে কম। নির্বাচনের আগে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি, যা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। ফলে দুই দেশের নেতৃত্বের কৌশলগত হিসাব ক্রমেই ভিন্ন দিকে যাচ্ছে।
তেহরানে নতুন নেতৃত্ব, সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তার ছেলে মোজতবা খামেনি এখন ক্ষমতার শীর্ষে বসেছেন।
এই নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই। ফলে সামরিক হামলা অব্যাহত থাকছে এবং সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
দুই দেশ একসঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত কীভাবে এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটবে—সেই প্রশ্ন এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















