ইরানের সঙ্গে নতুন যুদ্ধ শুরুর পর এটিকে অল্প সময়ের সামরিক অভিযান বলে বর্ণনা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ভাষায় এটি ছিল মাত্র “সংক্ষিপ্ত বিঘ্ন”। কিন্তু দুই সপ্তাহের মাথায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে এই সংঘাত দ্রুতই বিশ্ব নিরাপত্তা কাঠামো, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ, পর্যটন এবং বহু দেশের কৌশলগত জোটে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন এক অস্থিরতার দিকে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংঘাত
যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে। বিভিন্ন হামলায় এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর আকাশজুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ও কালো বৃষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে যে ভাবমূর্তি ছিল, সেটিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় বিলাসবহুল হোটেল, লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষতি হয়েছে। ফলে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকেই দ্রুত এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আতঙ্ক ও নিরাপত্তা সংকট
সংঘাতের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবির বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক বিদেশি পর্যটক ও নাগরিক আটকে পড়ায় বিভিন্ন দেশ উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিশেষ চার্টার বিমানের মাধ্যমে হাজারো নাগরিককে অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোও তাদের নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি। সেই আস্থাতেই বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও পর্যটন গড়ে উঠেছিল। যুদ্ধ সেই বিশ্বাসকেই এখন বড় আঘাত দিয়েছে।
তেলের দাম বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় একশ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং দ্রব্যমূল্য দ্রুত বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি আগে দেখা গিয়েছিল উনিশশো উনআশির ইরান বিপ্লবের পর, যখন বিশ্ব অর্থনীতি তেল সংকটে বড় ধাক্কা খেয়েছিল।
এই সংকট সামাল দিতে ইউরোপীয় দেশগুলো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার নিরাপদ করা যায়।
চীন, রাশিয়া ও ইউরোপে নতুন সমীকরণ
তেলের দাম বাড়ায় রাশিয়া লাভবান হচ্ছে, কারণ তাদের তেল বিক্রি থেকে যুদ্ধের অর্থ জোগান আরও শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বড়ভাবে নির্ভরশীল চীনের রপ্তানি খাতও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে চীনা পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে।
ইউরোপের দেশগুলো আবার নতুন শঙ্কার মুখে পড়েছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তাহলে ইরান–তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে ইউরোপে নতুন অভিবাসন ঢেউ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও প্রভাব
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। বাড়তে থাকা জ্বালানি দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিরোধী দল ইতোমধ্যে সমালোচনা শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই সংঘাত রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ ইরানও ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের শেষ কোথায়
ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, এই সংঘাতের শেষ কোথায় এবং যুদ্ধের পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে—তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















