মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া যুদ্ধ প্রায় দুই সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই সময়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতেও।
সংঘাতের বিস্তার ও বাড়তে থাকা হামলা
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা আরও বেড়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা পশ্চিম ও মধ্য ইরানে দুই শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র।
এদিকে তেহরানের পশ্চিমে কারাজ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম। একই সময়ে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা গেছে ওই অঞ্চলে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার কঠোর হুঁশিয়ারি
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্যে কড়া অবস্থান জানান। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে তাদের ভূখণ্ডে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে এসব ঘাঁটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি নিহতদের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।
ইসরায়েলের কৌশল ও বার্তা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সংঘাত শুরুর পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরানের ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। তবে তিনি সরাসরি সব সামরিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।
তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল যে, অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়িয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে পতনের দিকে ঠেলে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

পাল্টা হামলায় উত্তপ্ত অঞ্চল
ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। উত্তর ইসরায়েলের একটি আরব শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলে বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ আহত হন।
ইরাকেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে একটি মার্কিন বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। একই সময়ে ইরান সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ওই বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আতঙ্ক ও হামলার আশঙ্কা
কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানে বিভিন্ন স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। দুবাইয়েও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি ভবনে সামান্য ক্ষতি করেছে।
ইরানের হুমকির পর উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু ব্যাংক কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং কয়েকটি কার্যালয় আংশিকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা
সংঘাতের কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
এই প্রণালী বন্ধ থাকার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় একশ ডলারে পৌঁছায়। এর প্রভাবে শেয়ারবাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে কঠোর ভাষায় ইরানের নেতৃত্বের সমালোচনা করেন এবং যুদ্ধকে সফল বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
তবে তার এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী রাজনীতিকদের সমালোচনা শুরু হয়েছে। তারা অভিযোগ করছেন, যুদ্ধের মানবিক ক্ষতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব নিয়ে প্রশাসন পর্যাপ্ত তথ্য দিচ্ছে না।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাজনৈতিক সমাধান আসবে—তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। একই সঙ্গে যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















