ভারতের সংসদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবি তুলে আনুষ্ঠানিক নোটিশ জমা দিয়েছে বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা। শুক্রবার লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই এই নোটিশ জমা পড়েছে। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জন্য এমন আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাতটি অভিযোগ তুলে বিরোধীদের দাবি
বিরোধী দলগুলোর জমা দেওয়া দশ পৃষ্ঠার নোটিশে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সাতটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দায়িত্ব পালনে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী জালিয়াতির তদন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করা এবং বিপুল সংখ্যক ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ।
বিরোধী নেতারা দাবি করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা হয়েছে। বিশেষ করে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
বিভিন্ন রাজ্যের উদাহরণ তুলে বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধী দলগুলো পশ্চিমবঙ্গ, বিহারসহ কয়েকটি রাজ্যের উদাহরণ তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা বিরোধী শিবিরের ভোটারদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দলের প্রতিনিধি দলের এক বৈঠকের কথোপকথনের নথি প্রকাশ করার বিষয়টি দল বিবেচনা করছে। ওই বৈঠকের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বৈঠকে দলের প্রতিনিধিদের অপমান করা হয়েছে।
সংবিধানের বিধান ও অপসারণের প্রক্রিয়া
ভারতের সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের মতোই কঠোর। অর্থাৎ সংসদে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রস্তাব গৃহীত না হলে এ ধরনের পদক্ষেপ সম্ভব নয়।
আইন অনুযায়ী, যদি একই দিনে সংসদের দুই কক্ষেই এমন নোটিশ জমা পড়ে, তবে উভয় কক্ষেই প্রস্তাব গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা যাবে না। প্রস্তাব গৃহীত হলে লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান যৌথভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন।
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি স্বাক্ষর
নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যসভায় এমন নোটিশ আনতে অন্তত ৫০ জন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন এবং লোকসভায় প্রয়োজন ১০০ জনের স্বাক্ষর। বিরোধী জোটের জমা দেওয়া নোটিশে এই সীমা ছাড়িয়ে গেছে স্বাক্ষরের সংখ্যা। লোকসভায় ১৩০ জন এবং রাজ্যসভায় ৬৩ জন সংসদ সদস্য এতে স্বাক্ষর করেছেন।
সূত্র জানায়, এই উদ্যোগের নেতৃত্বে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। শুরুতে আলোচনা ছিল নোটিশটি সংসদের একটি কক্ষেই দেওয়া হবে কি না। তবে শেষ পর্যন্ত দুই কক্ষের বিরোধী সদস্যরাই এতে স্বাক্ষর করতে চান, যাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক
এই নোটিশ জমা পড়ার পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ক্ষমতাসীন শিবিরের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ফলে বিষয়টি এখন সংসদীয় প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপের দিকে এগোবে কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।












