মধ্যপ্রাচ্যে এক নাটকীয় মোড় তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপে। ইরানের বিরুদ্ধে আকস্মিক হামলার সিদ্ধান্ত শুধু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যই বদলে দেয়নি, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফেরা ট্রাম্প এখন উল্টো পথে হাঁটছেন—যেখানে সামরিক শক্তিই হয়ে উঠেছে তাঁর প্রধান হাতিয়ার।
যুদ্ধের সূচনা: হঠাৎ সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ প্রস্তুতি
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এক গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পকে জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবস্থান শনাক্ত করা গেছে। এর আগেই কয়েক মাস ধরে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। জেনেভায় আলোচনার অগ্রগতি না হওয়া এবং ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা ট্রাম্পকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
নিজের ব্যক্তিগত আবাসে সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই হামলার নির্দেশ দেন।
অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’: ভয়াবহ আঘাত
শনিবার ভোরে শুরু হওয়া অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের শতাধিক সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌযান, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালানো হয়।
এই হামলায় নিহত হন খামেনি এবং তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। তবে সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছাড়াও বেসামরিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পাল্টা আঘাত ও যুদ্ধের বিস্তার

ইরানও পাল্টা হামলা চালায়। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় কয়েকজন সেনা নিহত হয়।
ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, যুদ্ধ মানেই প্রাণহানি। তিনি বলেন, সংঘাত চললে আরও ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন সামরিক নীতি
ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প একাধিক দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। ইয়েমেন, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও অভিযান পরিচালনা করেছেন তিনি। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও ট্রাম্প এখন শক্তি প্রয়োগের নীতিতে ঝুঁকছেন। স্বল্প সময়ে এতগুলো দেশে হামলার নজির আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে বিরল।
ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন নেতৃত্ব নিয়েও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এমন নেতা চান যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী হবেন।
এই অবস্থান অনেকের কাছে সরাসরি শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
যুদ্ধের ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
এই হামলা নিয়ে বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ একে বড় কৌশলগত সাফল্য বলছেন, আবার কেউ এটিকে বিপজ্জনক জুয়া হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

কূটনীতি ব্যর্থ, যুদ্ধের পথ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এই সংঘাতের মূল কারণ। আলোচনা ব্যর্থ হওয়া, পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে গেলে সামরিক পদক্ষেপই একমাত্র বিকল্প হিসেবে সামনে আসে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















