কিয়েভ থেকে লেখা এই অভিজ্ঞতা যেন এক যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহরের শীতল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঘরের তাপমাত্রা অনেক সময় এমন পর্যায়ে নেমে যায় যে বাঁচতে হলে গায়ে একাধিক স্তরের শীতের পোশাক পরতে হয়। তবু এই ঠান্ডার মধ্যেও মানুষের ভেতরের উষ্ণতা নিভে যায়নি। রুশ হামলায় ইউক্রেনের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলেও, প্রতিবেশীরা একসঙ্গে রান্না করে পুরো ভবনের মানুষকে খাওয়াচ্ছেন।
বিদ্যুৎহীনতার মধ্যে টিকে থাকার লড়াই
কিয়েভে বিদ্যুৎ, পানি ও তাপ সরবরাহ কখনো কখনো টানা তিন দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকে। অনেকের জন্য এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। যাদের শারীরিক সক্ষমতা আছে, তারা কোনোভাবে সিঁড়ি বেয়ে পানি তুলে আনতে পারেন বা বিকল্প উপায়ে জীবন চালান। কিন্তু বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, কিংবা যেসব যোদ্ধা অঙ্গ হারিয়েছেন—তাদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন। বিদ্যুৎ ছাড়া কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ঠান্ডায় জমে গেলেও স্বাধীন
কিয়েভের মানুষের মনোভাবকে এক কথায় বলা যায়—“ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি, কিন্তু স্বাধীন আছি।” দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ক্লান্তি এসেছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি কেউ। প্রায় দেড় হাজার দিনের প্রতিরোধের ইতিহাস এখন তাদের গর্বের অংশ। অনেক সৈনিকই বলেন, তারা তাদের দাদার চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ করছেন।
মৃত্যু, স্মৃতি ও নতুন বিদায়ের ভাষা
এই যুদ্ধে অসংখ্য মানুষের মতো প্রাণ হারিয়েছেন তরুণ সমাজকর্মী ও চিকিৎসা সহায়তাকারী ইরিনা সিবুখ। তার মৃত্যুর পর বদলে গেছে বিদায় জানানোর ধরন। ফুলের পরিবর্তে দান, শোকের পরিবর্তে গান—এই নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তার ইচ্ছা থেকে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় শহরের মানুষ থেমে দাঁড়িয়ে নিহতদের স্মরণ করেন।
যুদ্ধের ডায়েরি: প্রতিটি মানুষের গল্প
ইউক্রেনে এখন প্রত্যেক মানুষের নিজের একটি ‘যুদ্ধের ডায়েরি’ আছে। একটি চকোলেটের বাক্সও যুদ্ধের স্মৃতি হয়ে উঠতে পারে, যখন সেটি তৈরির কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি মুহূর্ত—সবকিছুতেই যুদ্ধের ছাপ লেগে আছে।
ভাঙা জীবন জোড়া লাগানোর শিল্প
চার বছরে ইউক্রেনের মানুষ শিখেছে ভাঙা জীবন আবার জোড়া লাগাতে। ভোরের আগেই ভাঙা জানালা মেরামত, নতুন উপায়ে ঘর গরম রাখা, এবং প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করার কৌশল—সবকিছুই এখন জীবনের অংশ।
নিঃসঙ্গতাই সবচেয়ে বড় ভয়
এই যুদ্ধ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক লড়াইও। মানুষ এখনও টিকে আছে, এখনও লড়ছে। কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় একাকীত্বকে। যখন বিশ্ব তাদের কথা ভুলে যায়, তখন সেই নীরবতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শীত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















