মধ্যপ্রাচ্যের ঝলমলে নগরী দুবাই, যে শহর এতদিন নিজেকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তুলে ধরেছিল, হঠাৎ করেই যুদ্ধের বাস্তবতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইরানের ধারাবাহিক হামলা সেই আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে, আর প্রশ্ন উঠছে—এই শহরের মডেল কতটা টেকসই?
যুদ্ধের ছায়ায় বিলাসের শহর
ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ধরা পড়েছে। অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা হলেও বিস্ফোরণের শব্দ এখন শহরের দৈনন্দিন বাস্তবতা। একসময় যেখানে সমুদ্রসৈকতে নিশ্চিন্তে সময় কাটাত মানুষ, সেখানে এখন আকাশে যুদ্ধবিমান আর ড্রোনের দৃশ্য অস্বাভাবিক নয়।
শহরের বাসিন্দারা আতঙ্কে অফিস এড়িয়ে চলছেন, কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন পার্কিং এলাকায়। শিশুদের ভয় কমাতে বিস্ফোরণকে রমজানের আতশবাজি বলে বোঝানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার খবরও মিলেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশিও রয়েছেন।

বিমানবন্দর ও অর্থনীতিতে ধাক্কা
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হামলার কারণে বারবার বন্ধ রাখতে হয়েছে। হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা এই শহরের প্রধান শক্তি—বিশ্বব্যাপী সংযোগ—কে সরাসরি আঘাত করেছে।
দুবাই দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে, যেখানে পুঁজি, ব্যবসা ও প্রতিভার বিনিময় ঘটে। কিন্তু এই যুদ্ধ সেই ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
‘প্ল্যাটফর্ম শহর’ মডেলের সংকট
দুবাইকে অনেকেই একটি ‘প্ল্যাটফর্ম শহর’ হিসেবে দেখেন—যেখানে মানুষের স্থায়ী শিকড় কম, আর অর্থনৈতিক সুযোগই প্রধান আকর্ষণ। এখানে বসবাসকারীদের বড় অংশই বিদেশি, যাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই।
এই মডেল এতদিন সফল হলেও এখন তার দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। অনিশ্চয়তা বাড়তেই উচ্চ আয়ের প্রবাসীরা দ্রুত শহর ছাড়ার চেষ্টা করছেন। কারণ, তাদের কাছে দুবাই একটি স্থায়ী বাড়ি নয়, বরং একটি অস্থায়ী অবস্থান।

দ্রুত উত্থান, কিন্তু ভঙ্গুর ভিত্তি
গত দুই দশকে দুবাইয়ের জনসংখ্যা ও সম্পদের বিস্ময়কর বৃদ্ধি হয়েছে। লাখ লাখ ধনী ব্যক্তি এখানে এসেছেন, গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল জীবনযাপন। কিন্তু এই সাফল্যের ভিত্তি অনেকটাই ভাসমান—নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
যখন সেই নিরাপত্তাই প্রশ্নের মুখে, তখন শহরের আকর্ষণও কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
পরিচয়হীনতার প্রশ্ন
ঐতিহ্যগত শহরগুলোর মতো দুবাইয়ের সঙ্গে মানুষের গভীর আবেগ বা পরিচয় গড়ে ওঠে না। এখানে বসবাসকারীদের বড় অংশই নিজেদের অন্য কোথাও সংযুক্ত মনে করেন। ফলে সংকটের সময় শহর ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিচয়হীনতাই দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।

ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়িয়ে
দুবাই সম্ভবত এত বড় যে সহজে ধ্বংস হবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, ইতিহাস ও ভূগোলের শক্তি থেকে কোনো শহরই পুরোপুরি মুক্ত নয়। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা—যেকোনো কিছুই এমন শহরের ভিত্তিকে নড়িয়ে দিতে পারে।
এই সংকট একটাই প্রশ্ন সামনে আনছে—যে শহর কেবল সুযোগের ওপর দাঁড়িয়ে, সে কি সত্যিকারের স্থায়িত্ব পেতে পারে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















