ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন সপ্তাহ পরেও স্পষ্ট কোনো কৌশল সামনে আনতে পারেননি তিনি। এতে শুধু যুদ্ধের লক্ষ্যই অস্পষ্ট হয়ে পড়েনি, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৌশলহীন যুদ্ধের বাস্তবতা
যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প জনগণ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলকে কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা জানাননি। তিনি ইরানের সরকার পতনের কথা বললেও তা কীভাবে সম্ভব হবে, সে বিষয়ে কোনো বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেননি। আবার যদি লক্ষ্য সীমিত হয়, যেমন ইরানের পারমাণবিক উপাদান দখল, সেটিও কীভাবে অর্জন করা হবে তা স্পষ্ট নয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই যুদ্ধের একটি বড় প্রভাব হিসেবে তেলের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেছে এবং অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে।
সিদ্ধান্তে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি
ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই যুদ্ধকে বিশৃঙ্খল ও ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি সীমিত সংখ্যক উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ভিন্নমত বা সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নেননি। একই সঙ্গে তার প্রকাশ্য বক্তব্যগুলোতেও দেখা গেছে অসঙ্গতি ও বিভ্রান্তি।
এমনকি ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় ইরানের বহু স্কুলশিশুর মৃত্যু হলেও তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কিছু সামরিক সাফল্য, কিন্তু নেই দীর্ঘমেয়াদি দিশা
তবে যুদ্ধ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের জনগণের ওপর দমননীতি চালানো, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের কারণ ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা ও হামলার ফলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, সামরিক সক্ষমতা কমেছে এবং আঞ্চলিক প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কিন্তু এই সাফল্যগুলো কোনো সুসংহত কৌশলের অংশ নয়, বরং বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
তিনটি বড় কৌশলগত সংকট
যুদ্ধ শুরুর পর তিনটি বড় সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, সরকার পরিবর্তনের ধারণা বাস্তবে অনেক কঠিন হলেও তা সহজ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। ইতিহাস বলছে, শুধুমাত্র আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনো সরকার পতন ঘটানো প্রায় অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা কীভাবে সম্ভব হবে তা এখনও অনিশ্চিত। দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত অক্ষত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধ শেষে যদি এই মজুত থেকে যায়, তবে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি থেকেই যাবে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে ইরান তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। ফলে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি অস্থির হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অনিশ্চয়তা
পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর সহায়তা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। যেসব দেশকে তিনি আগে অবজ্ঞা করতেন, এখন তাদের কাছেই নৌ সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। এমনকি রাশিয়ার ওপর তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে, যা বিতর্ক তৈরি করেছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। সম্ভাবনা রয়েছে যে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে পারে, ইরানে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আসতে পারে অথবা সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা আত্মবিশ্বাস জাগায় না।
হোয়াইট হাউসের ভেতরের পরিকল্পনাও যথেষ্ট প্রস্তুতিহীন বলে মনে হচ্ছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করা, মিত্রদের সঙ্গে আগাম সমন্বয় না করা এবং জনগণকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যুদ্ধের ক্ষেত্রে বাস্তবতা অনেক কঠিন, যা রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রচারণার মাধ্যমে ঢেকে রাখা যায় না। ইরান যুদ্ধের শুরুতেই সেই বাস্তবতা সামনে চলে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















