আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে নতুন করে ভয়াবহ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে, যা দিন দিন আরও তীব্র আকার নিচ্ছে। দুই প্রতিবেশী দেশের এই লড়াইয়ে ইতোমধ্যে বহু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লক্ষাধিক মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আপাতত কোনো আলোচনা বা সমাধানের পথও খোলা নেই।
বেসামরিক মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব
সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানের বিমান হামলায় আবাসিক এলাকা, অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক হামলায় হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে, যেখানে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। একটি ঘটনায় রাজধানী কাবুলের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে হামলায় কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে কিশোররাও ছিল।
জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে অন্তত ৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় এক লাখ পনেরো হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সীমান্তজুড়ে যুদ্ধের বিস্তার
ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ এখন পুরো সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। রাত নামলেই গুলির শব্দ, মর্টার হামলা এবং বিমান হামলার আওয়াজে কেঁপে উঠছে পাহাড়ি অঞ্চল। আফগানিস্তানও পাল্টা ছোট আকারের ড্রোন হামলা ও সীমান্ত পোস্টে আক্রমণ চালিয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের একটি গ্রামে আফগান দিক থেকে ছোড়া মর্টার শেলে চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে অধিকাংশ প্রাণহানিই ঘটছে আফগান নাগরিকদের মধ্যে।
মানবিক সংকটের গভীরতা
সংঘর্ষের কারণে সীমান্তবর্তী বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। এসব শিবিরে নেই পর্যাপ্ত পানি বা খাবার। ধুলাবালিতে ভরা খাবার আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে বাস্তুচ্যুত মানুষরা।

অনেকেই শুধু গায়ের কাপড় পরে পালিয়ে এসেছে। কেউ অসুস্থ স্বজনকে ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার শিশুদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অভিযোগ
পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার একটি জঙ্গিগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে শতাধিক হামলা চালিয়েছে। যদিও আফগান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, ওই গোষ্ঠী কিছু সহায়তা পাচ্ছে।
দুই দেশের সেনাবাহিনীই একে অপরকে বড় ধরনের ক্ষতির দাবি করছে এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান জানানো হলেও তা এখনো উপেক্ষিত।
অর্থনীতি ও সীমান্তজীবনে প্রভাব

সংঘর্ষের কারণে সীমান্ত বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আফগানিস্তানের স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও জ্বালানির জন্য পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
একই সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর দৈনন্দিন জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মানুষ আতঙ্কে রাতে আলো জ্বালাতে ভয় পাচ্ছে, যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
সম্পর্কের টানাপোড়েন
দুই দেশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও জাতিগত সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সেই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। সীমান্তের দুই পাশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তবুও সাধারণ মানুষের আশা, এই সংঘাত দ্রুত থামবে। কারণ তারা জানে, এই যুদ্ধ কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















