বিশ্ব প্রযুক্তি খাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তাইওয়ান এখন এক গভীর ঝুঁকির নাম। চীনের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ বা অবরোধের আশঙ্কা সামনে আসতেই স্পষ্ট হচ্ছে—তাইওয়ান থেকে চিপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
তাইওয়ানের ওপর নির্ভরতার বিপদ
বিশ্বের উন্নতমানের প্রায় নব্বই শতাংশ চিপ উৎপাদন হয় তাইওয়ানে। স্মার্টফোন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত তথ্যকেন্দ্র—সবকিছুই এই চিপের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা প্রযুক্তি খাতকে এই নির্ভরতা কমাতে সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল পরিবর্তনে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।
এই পরিস্থিতিতে যদি চীন তাইওয়ানকে অবরোধ করে, তাহলে চিপ সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শিল্প কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃষ্টি হতে পারে অভূতপূর্ব সংকট।
সতর্কবার্তা উপেক্ষা, বাড়ছে ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বহু বছর ধরে বিভিন্ন উপায়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে নিজ দেশে চিপ উৎপাদনে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছে। কখনও ভর্তুকি, কখনও শুল্কের হুমকি—সবকিছুই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ ব্যয় এবং কম মুনাফার আশঙ্কায় অনেক কোম্পানি এই পরিবর্তনে অনীহা দেখিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনীহাই এখন বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কারণ, নতুন কারখানা তৈরি হলেও তার প্রভাব দেখা দিতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়
একটি গোপন শিল্প প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ান থেকে চিপ সরবরাহ বন্ধ হলে এটি হতে পারে মহামন্দার পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রায় এগারো শতাংশ সংকুচিত হতে পারে, যা দুই হাজার আট সালের মন্দার দ্বিগুণ। চীনের ক্ষেত্রেও ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভূরাজনীতি থেকে অর্থনীতির কেন্দ্রে তাইওয়ান
এক সময় তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল মূলত রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের অংশ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের ফলে তাইওয়ান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা এখন নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে নিজ দেশে চিপ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি নতুন কারখানা নির্মাণেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি চিপের খরচ বেশি এবং প্রযুক্তিগতভাবে অনেক ক্ষেত্রে তা এখনও পিছিয়ে।
এ কারণে অনেক কোম্পানি এখনো তাইওয়ানের ওপর নির্ভরতা কমাতে দ্বিধায় রয়েছে।
শিল্পখাতের দ্বিধা ও বাস্তবতা
প্রযুক্তি খাতের অনেক শীর্ষ নির্বাহী মনে করেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়িক লাভই তাদের প্রধান বিবেচনা। ফলে তারা ঝুঁকি জেনেও দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এই মনোভাবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানকে ঘিরে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট যে কোনো সময় বাস্তবে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















