মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়ে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
মিত্রদের অন্ধকারে রেখে হামলা
ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের যথাসময়ে অবহিত করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রথম হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কিছু দেশকে জানানো হয়। এতে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে। এমনকি হামলার পরও অনেক দেশ হোয়াইট হাউসের পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়নি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের মন্তব্য আরও বিতর্ক উসকে দেয়। তিনি আকস্মিক হামলার প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক পার্ল হারবারের উদাহরণ টেনে বক্তব্য দেন, যা কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে।
সামরিক সহায়তা নিয়ে দ্বন্দ্ব
ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চাইছে, অন্যদিকে তাদের অবদানকে অপর্যাপ্ত বলে সমালোচনাও করছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্পের কড়া অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কখনও সহায়তা চাওয়া, আবার কখনও তা অপ্রয়োজনীয় বলা—এই দ্বৈত অবস্থান মিত্রদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
ন্যাটো জোটের কিছু প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত হামলার সময় পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, যা সমন্বয়ের ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও জ্বালানি সংকট
ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে তেলের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা আরও বাড়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি, যা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে।
ইউরোপ ও আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় দেশগুলো এই যুদ্ধকে নিজেদের যুদ্ধ না বললেও তাদের স্বার্থ এতে জড়িয়ে আছে বলে জানিয়েছে। একই সময়ে আরব দেশগুলো একদিকে ইরানের হামলায় ক্ষুব্ধ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তেও বিরক্ত।
জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামত উপেক্ষা করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তে ইউরোপ বিস্মিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মতভেদ
এই যুদ্ধ শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়েই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিভক্তি তৈরি করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থকদের বড় একটি অংশ এখনো এই অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানকে বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে এই অভিযানের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন।
অনিশ্চয়তার মধ্যে কূটনৈতিক চেষ্টা
সব উত্তেজনার মধ্যেও ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল ও এশিয়ার কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার পথ খুঁজছে। তাদের লক্ষ্য একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখা।
তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত, এবং এই যুদ্ধ কতদূর গড়াবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















