মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গুনে জীবন এখন প্রতিদিনই আরও কঠিন হয়ে উঠছে। জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে শহরটির স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়েছে। মানুষের আলোচনার কেন্দ্রেও এখন যুদ্ধ নয়, বরং বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়।
জ্বালানি সংকটে বদলে গেছে শহরের গতি
ইয়াঙ্গুনে এখন গাড়ি চলাচলও নির্ভর করছে তারিখের ওপর। জোড় সংখ্যার দিনে কেবল নির্দিষ্ট নম্বরপ্লেটের গাড়ি রাস্তায় নামতে পারে, আর বিজোড় দিনে অন্যগুলো। এই অদ্ভুত ব্যবস্থা চালু হয়েছে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য। ফলে কিছু দিনে রাস্তা ফাঁকা থাকলেও অন্য দিনগুলোতে যানজট আরও বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রতিবেশী দেশ থেকেও জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় সংকট গভীর হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে।
আমদানি কমে, স্থানীয় পণ্যে নির্ভরতা
পণ্যের ঘাটতি মেটাতে সরকার স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো ধীরে ধীরে বাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সুপারমার্কেটগুলোতে এখন দেশীয় পণ্যের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক নেতৃত্ব এমন এক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাইছে যেখানে বাইরের ওপর নির্ভরতা কম থাকবে, যদিও এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ছে।
ক্ষমতার রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা
সম্প্রতি নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হলেও তা নিয়ে মানুষের আস্থা নেই। বিরোধী দল ছাড়া হওয়া নির্বাচনের পর গঠিত এই সংসদ মূলত সামরিক নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান শাসকই ক্ষমতায় থাকবেন, তবে তিনি কোন পদে থাকবেন তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব ও শহরের বৈপরীত্য
গ্রামাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় সংঘাত চললেও ইয়াঙ্গুন তুলনামূলক শান্ত। তবে এই শান্তির ভেতরেও রয়েছে তীব্র বৈষম্য। ধনী মানুষের জন্য পণ্য আসছে নানা উপায়ে, কিন্তু দরিদ্রদের জন্য জীবন হয়ে উঠেছে আরও কঠিন। শহরের অনেক মানুষ এখন আবর্জনার স্তূপে কিংবা নোংরা পানিতে জীবিকার সন্ধান করছে।
দারিদ্র্য ও অভিবাসনের ঢেউ
কয়েক বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক তরুণ দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পথও সংকুচিত। কেউ ভাষা শিখে বিদেশে কাজের আশা করছে, আবার কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ শহরে আসছে। ফলে ইয়াঙ্গুন আরও বৈচিত্র্যময় হলেও চাপ বাড়ছে অবকাঠামোর ওপর।
এক শহরের নিঃশব্দ সংকট
সব মিলিয়ে ইয়াঙ্গুন এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি। যেখানে উন্নতির আশা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইই প্রধান হয়ে উঠেছে। সামরিক শাসন হয়তো দেশকে এক করেছে, কিন্তু সেই ঐক্য গড়ে উঠছে অসন্তোষ আর ক্ষোভের ভিত্তিতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















