ব্রিটেনে তরুণদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এখন গভীর সংকটে। কয়েক বছর আগেও যেখানে ইউরোপের তুলনায় তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল দেশটি, সেখানে এখন চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, কাজের সুযোগ সংকোচন এবং সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনে তরুণদের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
দ্রুত বাড়ছে বেকারত্বের হার
সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে এই হার প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নেই। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি করতে পারে, যা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলবে।
দুর্বল অর্থনীতি ও চাকরির সংকট
ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গতি কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে খুচরা ও আতিথেয়তা খাতে। এই দুই খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় চাকরি কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি তাদের ওপর পড়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাই করছে এবং নতুন নিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। ভাড়া, খাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়ায় অনেক তরুণ অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন কাজেও টিকে থাকতে পারছে না। ফলে স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকায় তারা দ্রুত শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছে।
নীতিগত সিদ্ধান্তে চাপ বেড়েছে
সরকারের কিছু নীতি একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় নিয়োগদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর কাঠামোর পরিবর্তন এবং কর্মসংস্থানের নিয়ম কঠোর হওয়ায় নতুন কর্মী নেওয়ার খরচ বেড়ে গেছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান তরুণ কর্মী নিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।
সরকার তরুণদের চাকরিতে আনতে আর্থিক প্রণোদনা দিলেও তা সীমিত সংখ্যক মানুষের জন্য কার্যকর হচ্ছে। বাস্তবে এই উদ্যোগ সামগ্রিক সমস্যার তুলনায় অনেক ছোট পরিসরের বলে মনে করা হচ্ছে।
কাজ খোঁজার আগ্রহও কমছে
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক তরুণ এখন আর চাকরি খোঁজার চেষ্টাও করছে না। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, বারবার ব্যর্থতা এবং মানসিক চাপ তাদের হতাশ করে তুলছে।
বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকীত্ব এবং অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন তরুণদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে শ্রমবাজার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা ব্যবস্থার দুর্বলতা
স্কুল শেষে তরুণদের জন্য স্পষ্ট ও সহজ পথনির্দেশনার অভাব রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার জটিলতা তাদের বিভ্রান্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে কোন কোর্স বা প্রশিক্ষণ তাদের জন্য উপযোগী তা নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একই সঙ্গে শিক্ষানবিশ কর্মসূচির বড় অংশ এখন বয়স্কদের দখলে চলে যাচ্ছে। ফলে তরুণরা প্রয়োজনীয় হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব
সামাজিক বাস্তবতাও এই সংকটকে গভীর করেছে। পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং ডিজিটাল নির্ভরতা তরুণদের বাস্তব দক্ষতা ও যোগাযোগ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
এছাড়া অনেক তরুণ দীর্ঘদিন পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকায় তাদের দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে। এতে করে তারা আরও পিছিয়ে পড়ছে এবং কর্মসংস্থানে ফিরে আসা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় একাধিক খাতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শ্রমবাজারে তরুণদের জন্য সুযোগ বাড়ানো, নিয়োগদাতাদের ওপর চাপ কমানো এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং তরুণদের জন্য সহজ ও কার্যকর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে তরুণরা কর্মসংস্থানে ফিরে আসতে উৎসাহ পায়।
সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে এবং একটি পুরো প্রজন্ম কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
Sarakhon Report 


















