০৫:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধের আগুনে ইরানের নতুন কৌশল, ধ্বংসের মধ্যেই শক্তি জোগাচ্ছে তেহরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হলেও দেশটি ভেঙে পড়ার পথে নয়। বরং এই যুদ্ধকে ইরান নিজেদের জন্য কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে—বাইরের প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ এবং ভেতরে ক্ষমতা আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে।

যুদ্ধের ধাক্কায়ও টিকে থাকা ইরান
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে শুরু হওয়া বড় ধরনের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আলী খামেনিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে এবং বহু সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। তবুও তিন সপ্তাহ পরেও ইরান ভেঙে পড়েনি।

দেশটির কমান্ড কাঠামো এখনও কার্যকর রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফল
ইরান এই পরিস্থিতির জন্য অনেক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর থেকেই এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝেছিল বড় ধরনের হামলা আসতে পারে।

তাদের কৌশল ছিল দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, যাতে শত্রুপক্ষ ভবিষ্যতে হামলা করতে ভয় পায়। বর্তমানে ইরানের পাল্টা আক্রমণ সেই পরিকল্পনারই বাস্তব রূপ।

ভেতরের রাজনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব
যুদ্ধের আগে ইরানের সরকার অভ্যন্তরীণভাবে চাপে ছিল। বারবার গণবিক্ষোভ দমন করতে হচ্ছিল কঠোর শক্তি দিয়ে।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সরকার এই যুদ্ধকে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে জাতীয় ঐক্যের একটি নতুন পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের মতো।

হামলায় বেসামরিক মানুষ ও সেনাদের মৃত্যু শহীদ সংস্কৃতি তৈরি করছে, যা সরকারের পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

ইরানের পুরনো দ্বিধা ও নতুন কৌশল
গত এক দশকে ইরানকে অনেকেই দুর্বল ও সতর্ক রাষ্ট্র হিসেবে দেখেছে। ইসরায়েলের একাধিক হামলা বা হত্যাকাণ্ডের পরও তেহরান বড় প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

এই অবস্থার পেছনে ছিল একটি দ্বন্দ্ব। একদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে শক্ত অবস্থান দেখাতে হতো, অন্যদিকে সরাসরি বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়াতে হতো।

ফলে অনেক সময় ইরানের হামলা ছিল প্রতীকী, যা মিত্রদের আশ্বস্ত করলেও শত্রুদের কাছে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

আক্রমণাত্মক নীতিতে পরিবর্তন
পরিস্থিতি বদলাতে ইরান এখন প্রতিরক্ষামূলক কৌশল থেকে সরে এসে সরাসরি আক্রমণাত্মক পথে হাঁটছে।

তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভবিষ্যতে হামলার জবাবে দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং সংঘাতকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেবে। এর লক্ষ্য শুধু সামরিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করা।

এরই অংশ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের মাধ্যমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরির হুমকিও দিয়েছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
ইরানের নেতারা মনে করছেন, এই যুদ্ধ তাদের ক্ষমতা আরও মজবুত করতে পারে—যেমনটা হয়েছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়।

১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণের সময় ইরান ভেতরে বিভক্ত ছিল। কিন্তু যুদ্ধ সেই বিভাজন দূর করে সরকারকে আরও শক্তিশালী করে।

ধর্মীয় আবেগ, শহীদত্ব এবং জাতীয়তাবাদ ব্যবহার করে সরকার ব্যাপক জনসমর্থন পায়। একই ধারা এখন আবার দেখা যাচ্ছে।

নতুন নেতার উত্থান
মোজতবা খামেনি আগে আড়ালে থাকা এক ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং কঠিন সময়ে নেতৃত্বের প্রয়োজন—এই দুই কারণে তার অবস্থান শক্ত হচ্ছে।

যুদ্ধ তাকে ধীরে ধীরে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।

দুই ধরনের যুদ্ধ
এই সংঘাতে ইরান ও তার প্রতিপক্ষ ভিন্ন কৌশলে লড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উপরের স্তরে আঘাত করে রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়—নেতৃত্ব হত্যা ও অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে।

অন্যদিকে ইরান নিচের স্তরে কাজ করছে—জনগণকে সংগঠিত করা, জাতীয়তাবাদ জাগানো এবং অভ্যন্তরীণ সমর্থন শক্তিশালী করা।

যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান এই সংঘাতকে শুধু টিকে থাকার লড়াই হিসেবে নয়, বরং নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ হিসেবেই দেখছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধের আগুনে ইরানের নতুন কৌশল, ধ্বংসের মধ্যেই শক্তি জোগাচ্ছে তেহরান

১০:০৭:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হলেও দেশটি ভেঙে পড়ার পথে নয়। বরং এই যুদ্ধকে ইরান নিজেদের জন্য কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে—বাইরের প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ এবং ভেতরে ক্ষমতা আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে।

যুদ্ধের ধাক্কায়ও টিকে থাকা ইরান
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে শুরু হওয়া বড় ধরনের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আলী খামেনিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে এবং বহু সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। তবুও তিন সপ্তাহ পরেও ইরান ভেঙে পড়েনি।

দেশটির কমান্ড কাঠামো এখনও কার্যকর রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফল
ইরান এই পরিস্থিতির জন্য অনেক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর থেকেই এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝেছিল বড় ধরনের হামলা আসতে পারে।

তাদের কৌশল ছিল দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, যাতে শত্রুপক্ষ ভবিষ্যতে হামলা করতে ভয় পায়। বর্তমানে ইরানের পাল্টা আক্রমণ সেই পরিকল্পনারই বাস্তব রূপ।

ভেতরের রাজনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব
যুদ্ধের আগে ইরানের সরকার অভ্যন্তরীণভাবে চাপে ছিল। বারবার গণবিক্ষোভ দমন করতে হচ্ছিল কঠোর শক্তি দিয়ে।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সরকার এই যুদ্ধকে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে জাতীয় ঐক্যের একটি নতুন পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের মতো।

হামলায় বেসামরিক মানুষ ও সেনাদের মৃত্যু শহীদ সংস্কৃতি তৈরি করছে, যা সরকারের পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

ইরানের পুরনো দ্বিধা ও নতুন কৌশল
গত এক দশকে ইরানকে অনেকেই দুর্বল ও সতর্ক রাষ্ট্র হিসেবে দেখেছে। ইসরায়েলের একাধিক হামলা বা হত্যাকাণ্ডের পরও তেহরান বড় প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

এই অবস্থার পেছনে ছিল একটি দ্বন্দ্ব। একদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে শক্ত অবস্থান দেখাতে হতো, অন্যদিকে সরাসরি বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়াতে হতো।

ফলে অনেক সময় ইরানের হামলা ছিল প্রতীকী, যা মিত্রদের আশ্বস্ত করলেও শত্রুদের কাছে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

আক্রমণাত্মক নীতিতে পরিবর্তন
পরিস্থিতি বদলাতে ইরান এখন প্রতিরক্ষামূলক কৌশল থেকে সরে এসে সরাসরি আক্রমণাত্মক পথে হাঁটছে।

তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভবিষ্যতে হামলার জবাবে দ্রুত ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং সংঘাতকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেবে। এর লক্ষ্য শুধু সামরিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করা।

এরই অংশ হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের মাধ্যমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরির হুমকিও দিয়েছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
ইরানের নেতারা মনে করছেন, এই যুদ্ধ তাদের ক্ষমতা আরও মজবুত করতে পারে—যেমনটা হয়েছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়।

১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণের সময় ইরান ভেতরে বিভক্ত ছিল। কিন্তু যুদ্ধ সেই বিভাজন দূর করে সরকারকে আরও শক্তিশালী করে।

ধর্মীয় আবেগ, শহীদত্ব এবং জাতীয়তাবাদ ব্যবহার করে সরকার ব্যাপক জনসমর্থন পায়। একই ধারা এখন আবার দেখা যাচ্ছে।

নতুন নেতার উত্থান
মোজতবা খামেনি আগে আড়ালে থাকা এক ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং কঠিন সময়ে নেতৃত্বের প্রয়োজন—এই দুই কারণে তার অবস্থান শক্ত হচ্ছে।

যুদ্ধ তাকে ধীরে ধীরে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।

দুই ধরনের যুদ্ধ
এই সংঘাতে ইরান ও তার প্রতিপক্ষ ভিন্ন কৌশলে লড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উপরের স্তরে আঘাত করে রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়—নেতৃত্ব হত্যা ও অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে।

অন্যদিকে ইরান নিচের স্তরে কাজ করছে—জনগণকে সংগঠিত করা, জাতীয়তাবাদ জাগানো এবং অভ্যন্তরীণ সমর্থন শক্তিশালী করা।

যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান এই সংঘাতকে শুধু টিকে থাকার লড়াই হিসেবে নয়, বরং নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ হিসেবেই দেখছে।