যুদ্ধের আগে কী পরিকল্পনা ছিল
যুদ্ধ শুরুর আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের বিরোধী শক্তিকে সক্রিয় করে দ্রুত অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে শুরুতেই লক্ষ্যবস্তু করা এবং পরে বিভিন্ন গোপন অভিযান চালিয়ে জনগণকে রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন নেতৃত্বও এই ধারণায় সমর্থন দেয় এবং বিশ্বাস করা হয়, এতে সরকার পতন ঘটতে পারে।
কেন বাস্তবে তা ঘটল না
যুদ্ধ শুরু হলেও ইরানে বড় ধরনের কোনো গণবিদ্রোহ দেখা যায়নি। বরং দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ মানুষ সরকারকে অপছন্দ করলেও জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে রাজি নয়। ফলে প্রত্যাশিত গণআন্দোলন তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে বাইরে থাকা জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকেও কোনো বড় আক্রমণ দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভুল হিসাব
এই পরিকল্পনার অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল ইরানের ভেতরে বিদ্রোহের সম্ভাবনাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া। অনেক মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাই আগে থেকেই এই ধারণা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।
তাদের মতে, যুদ্ধ চলাকালে বোমা হামলার মধ্যে জনগণ রাস্তায় নামবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত ছিল না। বরং এই আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও কঠোর করে তোলে এবং সরকারকে শক্ত অবস্থান নিতে সহায়তা করে।
নেতানিয়াহুর হতাশা
যুদ্ধ শুরুর পরপরই প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় নেতানিয়াহু হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি আশঙ্কা করেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারে, অথচ মোসাদের পরিকল্পনা তখনো কার্যকর হয়নি।
তবে প্রকাশ্যে তিনি এখনো আশা প্রকাশ করছেন যে, ভবিষ্যতে ইরানের জনগণ সুযোগ পেলে রাস্তায় নামতে পারে।
কুর্দি পরিকল্পনার জটিলতা
এই পরিকল্পনার একটি অংশ ছিল ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সীমান্ত থেকে আক্রমণ চালানো। কিন্তু এই উদ্যোগ নিয়েও দ্বিধা দেখা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র পরে এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে, কারণ এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইরের কোনো গোষ্ঠী আক্রমণ করলে ইরানের জনগণ উল্টো জাতীয়তাবাদের কারণে সরকারের পাশে দাঁড়াতে পারে।
গোয়েন্দা মূল্যায়নে কী বলা হচ্ছে
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরানের সরকার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। অতীতে বড় বড় বিক্ষোভও দ্রুত দমন করা হয়েছে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো—কঠোরপন্থী শক্তিগুলোই ক্ষমতা ধরে রাখবে। কোনো গৃহযুদ্ধ হলেও তা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের বদলে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।
মোসাদের পুরোনো ও নতুন কৌশল
আগে মোসাদ মনে করত, ইরানে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গোপন হত্যা এবং পারমাণবিক স্থাপনায় নাশকতার মাধ্যমে সরকারকে দুর্বল করার কৌশল নেয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নেতৃত্ব এই অবস্থান বদলে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনায় জোর দেয়। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়েছে, শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে কোনো দেশে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। স্থলভিত্তিক শক্তি ছাড়া এমন পরিবর্তন আনা কঠিন।
ইসরায়েল এখনো আশা করছে, ভবিষ্যতে ইরানের জনগণ নিজেই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবে। তবে এখন পর্যন্ত সেই লক্ষণ স্পষ্ট নয়, ফলে যুদ্ধের পরিণতি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















