যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়, যখন সরাসরি হামলা শুরু হয় পারস্য উপসাগরের জ্বালানি উৎপাদনের মূল অবকাঠামোর ওপর। এতে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন আর প্রশ্ন শুধু যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নয়, বরং এর প্রভাব কত মাস বা বছর স্থায়ী হতে পারে—তা নিয়েই আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন বন্ধ হওয়া সাময়িক সমস্যা হলেও অবকাঠামোর ওপর হামলা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়।
এই নতুন পরিস্থিতির সূচনা হয় বুধবার, যখন ইরান কাতারের রাস লাফান জ্বালানি কমপ্লেক্সে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই স্থাপনাটি বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে, যা এশিয়া ও ইউরোপে ঘর গরম রাখা, রান্না, শিল্পকারখানা চালানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
এরপর কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের বিভিন্ন শোধনাগার ও গ্যাস স্থাপনাতেও হামলা হয়। এই হামলার আগে ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আঘাত হেনেছিল।
ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। তবে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, ক্ষতি মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং এতে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানেও ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। স্বল্প ব্যয়ের অস্ত্র ব্যবহার করে তারা অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
বর্তমানে অনেক জ্বালানি স্থাপনা বন্ধ থাকলেও বেশিরভাগই অক্ষত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কয়েক মাসের মধ্যে উৎপাদন আবার শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে হামলা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও খারাপ হতে পারে।
এই সংকট ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিহাসে এটাই তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন। ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে।
জ্বালানির দাম যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৩ ডলার ছিল, তা ২০২৬ সালে ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে, বেকারত্ব বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়। বিশেষ করে ডিজেল ও বিমান জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ে, যা পণ্য পরিবহনে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য থেকে শুরু করে গাড়ি, মোবাইল ফোন, ওষুধ—সবকিছুর দাম বাড়তে পারে।
এদিকে জাহাজ চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। পারস্য উপসাগরে হাজারো জাহাজ আটকে আছে। বড় শিপিং কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের সতর্ক করেছে যে প্রয়োজনে তারা পণ্য নিকটবর্তী বন্দরে নামিয়ে দিতে পারে, যার অতিরিক্ত খরচ গ্রাহকদেরই বহন করতে হবে।
এই সংকটে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করার স্থাপনা তুলনামূলক কম, এবং কাতারের বৃহত্তম স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব আরও বেশি। এর ফলে সার ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে, যা সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব জ্বালানি স্থাপনাকে নিরাপদ মনে করা হতো, সেগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে এই ঝুঁকি ভবিষ্যতেও জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলবে।
এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো, যারা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল, তারা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যের গ্যাসের মুখোমুখি হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিছু দেশ জ্বালানি কর কমিয়েছে বা স্থগিত করেছে, আবার কিছু দেশ মূল্যসীমা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে, পাকিস্তানে স্কুল দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি রেশনিং চালু হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জ্বালানি সংকটের ধাক্কা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যে নতুন এই সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে দীর্ঘদিনের মহামারি, সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির পর অনেক দেশের বাজেট দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে।
প্যাট্রিসিয়া কোহেন 



















