মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সোমবার ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি জানান, তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে “গঠনমূলক আলোচনা” শুরু হয়েছে।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এই দাবি অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, যুদ্ধ শেষের কোনো শর্ত নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা চলছে না। একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, যোগাযোগগুলো এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তাতে তেমন কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
শনিবার ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলার যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা থেকে সরে আসার একটি সুযোগ হিসেবেই তিনি এই প্রাথমিক সংলাপকে ব্যবহার করেছেন। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে এই হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা সোমবার শেষ হওয়ার কথা ছিল।
সোমবার ট্রাম্প জানান, আলোচনার সুযোগ দিতে তিনি সময়সীমা শুক্রবার পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। এতে বিভিন্ন দেশ কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। তবে এই সংঘাতের বাস্তব সমাধান কতটা সম্ভব, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা পাঁচ দিনের একটি সময় দিচ্ছি। দেখব কী হয়। ভালো হলে সমাধান হবে, না হলে আমরা আমাদের মতো করে হামলা চালিয়ে যাব।”
একদিকে হামলার হুমকি স্থগিত করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর অন্যান্য হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং মার্কিন সামরিক শক্তিও অঞ্চলে বাড়ানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করা বা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সুরক্ষায় স্থলবাহিনী পাঠানোর মতো আরও কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনায় রয়েছে।
ট্রাম্প আলোচনার বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি বলেন, তার জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই আলোচনা পরিচালনা করছেন। মার্কিন ও ইরানি সূত্র বলছে, উইটকফ সরাসরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
মার্কিন পক্ষ এখনো দাবি করছে, ইরানকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং সম্ভাব্য অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের মজুদ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে—যা ইরান আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে। ফেব্রুয়ারির শেষে এই বিষয়েই আলোচনা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে।
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের বক্তব্যকে “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তৈরি সংকট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা” বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বার্তালাপ মূলত উত্তেজনা কমানোর উপায় খোঁজার একটি প্রাথমিক চেষ্টা। তারা স্থায়ী শান্তিচুক্তি চান, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভবিষ্যতে আর হামলা না করে—এমন নিশ্চয়তা থাকে। পাশাপাশি তারা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টিও সামনে এনেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক সংকট গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ওয়ায়েজ বলেন, ট্রাম্পের “গঠনমূলক আলোচনা” মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি আশাবাদী। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর দাবিগুলো থেকে সরে আসার নিশ্চয়তা না পেলে ইরান উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় যাবে না।
তিনি বলেন, “জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না করা খুবই ন্যূনতম বিষয়। যুদ্ধবিরতি বা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মতো কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি নয়।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ট্রাম্প মনে করেন সামরিক সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তবে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইসরায়েল তাদের অভিযান থামাবে না।
তিনি বলেন, “আমরা ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করছি এবং হিজবুল্লাহর ওপরও আঘাত অব্যাহত রেখেছি।” তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল সম্প্রতি ইরানের আরও দুইজন পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে।
পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলো মধ্যস্থতায় আগ্রহী নয়, কারণ ইরান তাদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসর আলোচনায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাবও দিয়েছে, যদিও এখনো কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, “এগুলো সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা চালাবে না। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া কোনো কিছু চূড়ান্ত ধরা উচিত নয়।”
এই আলোচনার সম্ভাবনা ট্রাম্পকে সময় কিনে দিয়েছে, যাতে তিনি হরমুজ প্রণালী আবার খুলতে পারেন এবং নিজের তৈরি সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পান। শনিবার তিনি বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রণালী না খুললে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র “ধ্বংস করে দেওয়া হবে”।
কিন্তু পরে স্পষ্ট হয়, এমন হামলা হলে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আবার হুমকি থেকে সরে গেলে ইরানের কাছে দুর্বলতার বার্তা যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার প্রমাণ। তাদের ভাষায়, “ইরানের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ট্রাম্প তার ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম থেকে সরে এসেছেন।”
অভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর। যুদ্ধের প্রভাবে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে তেল ও গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের তেল সংকটের চেয়েও ভয়াবহ বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের আলোচনার ঘোষণা কিছুটা হলেও জ্বালানির দাম কমিয়েছে, তবে যুদ্ধ শেষের বাস্তব অগ্রগতি না হলে এই স্বস্তি টিকবে কি না, তা অনিশ্চিত।
ট্রাম্প সোমবার বলেন, হরমুজ প্রণালী খুব শিগগিরই খুলে যাবে এবং এটি “যৌথভাবে নিয়ন্ত্রিত” হবে। কে নিয়ন্ত্রণ করবে—এ প্রশ্নে তিনি রসিকতা করে বলেন, “হয়তো আমি, হয়তো আয়াতুল্লাহ—যে-ই হোক।”
টাইলার পেজার, ডেভিড ই. স্যাঙ্গার, ফারনাজ ফাসিহি 



















