যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ইরানকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি একসময় কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু এক দশক পর একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে এখন নিজেই ইরানের ওপর তেলের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন সমুদ্রপথে থাকা প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১০০ ডলার হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত ইরানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অথচ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।
সমালোচকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত ইরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দুর্বলতাও প্রকাশ করছে। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রিচার্ড নেফিউ মন্তব্য করেন, এই পদক্ষেপ ইরানকে এমন অবস্থানে বসিয়েছে যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও। এক মাস আগে যেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ছিল ২.৯৪ ডলার, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩.৯৫ ডলার। ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে ট্রেজারি বিভাগের দেওয়া ‘সাধারণ লাইসেন্স’ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এই লাইসেন্স অনুযায়ী এক মাসের জন্য ইরানি তেল অধিকাংশ দেশে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও বিক্রি করা যাবে।
ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে কৌশলগত চাল হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তারা ইরানের তেলকেই ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। তার দাবি, বাজারে বেশি তেল সরবরাহ হলে দাম কমবে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সুবিধা পাবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুক্তি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কারণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে ইরান আরও বেশি লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে চীনের মতো দেশে ছাড় মূল্যে তেল বিক্রির পরিবর্তে তারা উচ্চমূল্যে বিক্রির সুযোগ পাবে।
ইরান বর্তমানে বেশিরভাগ তেল চীনে রপ্তানি করে এবং এর বড় অংশই ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নামে পরিচিত গোপন ট্যাংকারের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত হয়। ফলে সমুদ্রে থাকা তেলের কতটা অন্য দেশে সরানো সম্ভব, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এছাড়া ট্রেজারি বিভাগের ঘোষণায় কোথাও উল্লেখ নেই যে যুক্তরাষ্ট্র এসব লেনদেন বন্ধ করতে পারবে। যদিও উত্তর কোরিয়া, কিউবা এবং রাশিয়ার দখলকৃত ইউক্রেন অঞ্চলে তেল বিক্রি এখনও নিষিদ্ধ রয়েছে। এই ছাড় ২০ মার্চ থেকে কার্যকর হয়ে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।
ডেমোক্র্যাটরা দ্রুত এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ট্রাম্পের দ্বিচারিতা তুলে ধরেছেন। তারা মনে করিয়ে দেন, ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী থাকাকালে ট্রাম্প ওবামার সময় ইরানকে দেওয়া অর্থকে ‘কেলেঙ্কারি’ বলেছিলেন।
ভার্জিনিয়ার সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার প্রশ্ন তুলেছেন, তখন ৪০০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে এত সমালোচনা হলেও এখন কেন কোনো প্রতিবাদ নেই।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজমের কার্যালয় সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করে ব্যঙ্গ করে জানায়, একসময় ওবামার বিরুদ্ধে ‘নগদ অর্থের প্যালেট’ নিয়ে অভিযোগ তোলা হলেও এখন ট্রাম্প বাস্তবেই ইরানকে অর্থের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান এই তেল বিক্রি থেকে খুব বেশি লাভ করতে পারবে না এবং তিনি চান বাজারে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ থাকুক। তার ভাষায়, এই অর্থ যুদ্ধের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না, বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখাই তার লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানকে দেওয়া অর্থ ছিল পুরোনো এক অস্ত্রচুক্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির অংশ। ১৯৭৯ সালে ইরানের শাহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সেই অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, কিন্তু অর্থ ফেরত দেয়নি। পরবর্তীতে সেই অর্থ নগদে ফেরত দেওয়া হয়, কারণ ব্যাংকগুলো নিষেধাজ্ঞা ভাঙার আশঙ্কায় সরাসরি লেনদেন করতে রাজি ছিল না।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















