যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার পরও ইরান পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েনি—বরং পাল্টা আঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কৌশলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত এক নতুন মোড় নিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে নিজেদের সামরিক সাফল্য জোর দিয়ে তুলে ধরলেও বাস্তবে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠছে। হামলার সংখ্যা কয়েক দিনের মধ্যে হাজার থেকে কয়েক হাজারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বিমান অভিযান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবুও এই আক্রমণ ইরানকে সম্পূর্ণভাবে অচল করতে পারেনি। দেশটি নিয়মিত পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, বিশেষ করে ভিন্নধর্মী ও অপ্রচলিত কৌশলে। এর ফলে যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়ছে এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও তীব্র হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাব ও তেলের বাজারে অস্থিরতা
ইরানের প্রতিক্রিয়ায় পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে, যেখানে দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
এ পর্যন্ত এই সংঘাতে ইরান, লেবানন, ইসরায়েলসহ পুরো অঞ্চলে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলেই ভরসা ইরানের
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান কখনোই সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করার পরিকল্পনা করেনি। বরং তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলার কৌশল নিয়েছে। ছোট নৌযান, মাইন পাতা, দ্রুত আক্রমণ এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে বিস্তৃত করছে।
একই সঙ্গে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো লেবানন ও ইরাক থেকে হামলায় অংশ নিচ্ছে, যা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যত বেশি দেশকে এই যুদ্ধের প্রভাবে টেনে আনা এবং চাপ সৃষ্টি করা।
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই মূল লক্ষ্য
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নেতৃত্বের কাছে এই যুদ্ধ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকার টিকে থাকলেই তারা নিজেদের বিজয় দাবি করতে পারবে, যদিও দেশের ভেতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটছে। শহরাঞ্চলে মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, অনেকেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নেতৃত্বের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনের স্বপ্ন কতটা বাস্তব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধের মাধ্যমে একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন দেখালেও ইতিহাস বলছে, এমন প্রচেষ্টা প্রায়ই উল্টো ফল দিয়েছে। লেবানন যুদ্ধ বা ইরাক আক্রমণের মতো অতীত উদাহরণগুলো দেখায়, সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা সহজ নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রত্যাশা এই ধরনের অভিযানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য অর্জন করা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।
জনমত ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক
ইসরায়েলের ভেতরেও সমালোচনা বাড়ছে যে জনগণের সামনে বাস্তবতার চেয়ে অতিরঞ্জিত সাফল্যের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়ার প্রবণতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, যেখানে স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















