আলাবামার বার্মিংহাম শহরতলীতে তিন দশক ধরে নীরবে চলে আসছিল ইসলামিক একাডেমি অব আলাবামা। রাজ্যের সবচেয়ে ভালো ফলাফলকারী স্কুলগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের স্নাতক হার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগ। কিন্তু গত গ্রীষ্মে যখন স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের ২৭০ জন শিক্ষার্থীর জন্য কাছের হুভার শহরে একটি বড় ভবনে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়, তখনই শুরু হয় তীব্র বিরোধিতা।
স্থানীয় ডানপন্থী পডকাস্ট উপস্থাপক ও 1819 নিউজ আউটলেটের প্রধান ব্রায়ান ডসন একটি তৃণমূল প্রচারণার নেতৃত্ব দেন। তিনি জানান, স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ছিল এমন যে তারা এতদিন এই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই জানতেন না, আর এখন হঠাৎ বড় ভবন দরকার হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হুভার শহর কর্তৃপক্ষ স্কুলের স্থানান্তর প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।
সিনেটর থেকে কংগ্রেস, রাজনৈতিক মহলে ইসলামবিরোধী বক্তব্যের প্রতিযোগিতা
আলাবামার সিনিয়র মার্কিন সিনেটর টমি টিউবারভিল সোশ্যাল মিডিয়ায় এই স্কুলকে আক্রমণ করে বলেন, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের আলাবামায় কোনো স্থান নেই। পরে তিনি আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে ইসলামকে ধর্ম নয় বরং একটি কাল্ট বলে বর্ণনা করেন। সিনেট ফ্লোরে তিনি ইসলামকে এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ বলে চিহ্নিত করেন যা অমুসলিমদের হত্যায় উৎসাহিত করে।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসলামকে ভয় পাওয়া অযৌক্তিক নয়। তিনি যোগ করেন, সব মুসলিম সন্ত্রাসী নয়, তবে অনেকেই সন্ত্রাসী, আর যারা উদারপন্থী তারাই আসলে চরমপন্থী নয়।

ওকলাহোমা, টেক্সাস, জর্জিয়া, সারা দেশে একই চিত্র
এই ইসলামভীতি শুধু আলাবামায় সীমাবদ্ধ নয়। ওকলাহোমায় তুলসার কাছে ব্রোকেন অ্যারো শহরে একটি ইসলামিক সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব স্থানীয় রক্ষণশীল নেতাদের বিরোধিতায় জানুয়ারিতে বাতিল হয়ে যায়। প্রাক্তন স্পিকার টি ডব্লিউ শ্যানন বলেন, ওকলাহোমায় এমন নেতৃত্ব দরকার যারা মন্দের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
টেক্সাসে ক্রমবর্ধমান মসজিদ নির্মাণকে সামাজিক রক্ষণশীল গোষ্ঠী টেক্সাস ফ্যামিলি প্রজেক্ট গত মাসে সতর্কবার্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জর্জিয়ায় লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদপ্রার্থী গ্রেগ ডলেজাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি জিহাদি আক্রমণের ছবি ব্যবহার করে প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি লন্ডনের পতন ও ইউরোপের অবস্থা উল্লেখ করে আমেরিকায় শরিয়ামুক্ত পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব
এই ইসলামবিরোধী জোয়ার আসছে এমন সময়ে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করছেন। তিনি সোমালি অভিবাসীদের অবমাননাকর ভাষায় বর্ণনা করেছেন এবং দুই মুসলিম ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন। তাঁর প্রশাসন দুই ডজনের বেশি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ ম্যাথিউ ড্যালেক বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সেনা হতাহত বাড়লে এবং বোমাবর্ষণ মধ্যপ্রাচ্যে আরও অস্থিরতা তৈরি করলে এই ধরনের মুসলিমবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
শরিয়া ফ্রি আমেরিকা ককাস ও মুসলিম জনসংখ্যার বাস্তবতা
গত ডিসেম্বরে কংগ্রেসে রক্ষণশীল রিপাবলিকানরা শরিয়া ফ্রি আমেরিকা ককাস গঠন করেছেন, যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪৫ জন হাউস রিপাবলিকান। ককাসটি যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব রোধ করার লক্ষ্য ঘোষণা করলেও এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ইলিয়া সোমিন বলেন, মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম একটি অভিবাসী গোষ্ঠী কোনোভাবে দেশ দখল করে শরিয়া আইন চাপিয়ে দেবে, এই ভাবনা হাস্যকর আতঙ্ক ছাড়া আর কিছু নয়।
কেটো ইনস্টিটিউটের ইসলাম বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মোস্তফা আকিওল বলেন, মুসলিম জনগোষ্ঠী রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়ায় অভিবাসন খারাপ এবং অভিবাসীদের ভয় পাওয়া উচিত, এই ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে।

স্কুলের শিক্ষকদের হতাশা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ইসলামিক একাডেমির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে সিনেটর টিউবারভিল স্কুলটি না দেখেই এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষিকা ফেলিসিটি লাফেভ্র বলেন, তিনি কীভাবে জানবেন আমরা কারা বা আমরা কী করি? তাঁর ছাত্ররা তো জানেই না ইনফিডেল শব্দটির অর্থ কী।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্ট্যাসি আবদেইন বলেন, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দুটি মিথ্যা অভিযোগ হলো তারা শরিয়া আইন শেখাচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীদের অমুসলিম হত্যার শিক্ষা দিচ্ছেন, যার দুটোই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ নতুন স্থান খোঁজা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কারণ সিনেটর টিউবারভিল, যিনি বলেছেন এই স্কুলের এখানে থাকার দরকার নেই, তিনি আগামী নভেম্বরে আলাবামার গভর্নর নির্বাচনে জয়ের প্রবল দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















