দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আফগানিস্তানকে নিজেদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখেছে পাকিস্তান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নীতির ভিত্তিই এখন ভেঙে পড়ছে। একসময়ের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা আজ উল্টো পাকিস্তানের জন্য বড় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে।
নীতির উল্টো ফল: মিত্রই এখন হুমকি
সোভিয়েত যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে তালেবানের উত্থান এবং কাবুল পতনের পরবর্তী সময়—সব ক্ষেত্রেই আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছে ইসলামাবাদ। কিন্তু সেই সময়ে যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তারাই এখন পাকিস্তানের ভেতরে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের হামলা বাড়ায় দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কঠোর পদক্ষেপেও মিলছে না সমাধান
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সীমান্তে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে, সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালাচ্ছে এবং আফগান শরণার্থীদের ব্যাপকভাবে ফেরত পাঠাচ্ছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ সমস্যার মূল কারণ স্পর্শ করতে পারছে না, বরং সাময়িক প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
মূল সংকট: স্বাধীন আফগানিস্তানকে মানতে না পারা
সমস্যার গভীরে রয়েছে একটি মৌলিক বাস্তবতা—পাকিস্তান কখনোই পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি যে আফগানিস্তান নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বিভিন্ন সময়ে আফগান নেতারা পাকিস্তানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, যা জাতীয়তাবোধ ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
ডুরান্ড রেখা: ইতিহাসের অমীমাংসিত ক্ষত

ডুরান্ড রেখা নিয়ে বিরোধ আজও দুই দেশের সম্পর্কের বড় বাধা। পাকিস্তান এটিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে মেনে নিলেও অনেক আফগান এটিকে উপনিবেশিক আমলের চাপিয়ে দেওয়া সীমারেখা হিসেবে দেখে। সীমান্তে কাঁটাতার ও সামরিকীকরণ এই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
কৌশলগত গভীরতার ধারণার সীমাবদ্ধতা
ভারতকে ঘিরে থাকার আশঙ্কা থেকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানকে ‘কৌশলগত গভীরতা’ হিসেবে দেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে, আফগানিস্তানের রাজনীতি বাইরের প্রভাব সহজে মেনে নেয় না। ইতিহাস জুড়েই দেশটি সাম্রাজ্য, পরাশক্তি কিংবা প্রতিবেশী—কাউকেই আধিপত্য বিস্তার করতে দেয়নি।

ভবিষ্যতের পথ: চাপ নয়, সহযোগিতা
বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি কৌশল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়। প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রক্সি ব্যবহারের নীতি শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস ও প্রতিক্রিয়ার চক্র তৈরি করে। টেকসই সমাধানের জন্য দরকার পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান ও আঞ্চলিক সহযোগিতা।
পাকিস্তানের সামনে এখন ইতিহাসের স্পষ্ট বার্তা—আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এই বাস্তবতা যত দ্রুত মেনে নেওয়া যাবে, তত দ্রুতই সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের নতুন পথ খুলে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















