ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত বিশ্বজুড়ে কৃষি খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। বিশেষ করে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা পড়েছেন চাপে, যা ভবিষ্যতে খাদ্যের দাম বাড়ার বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব: সার সংকট ও বাড়তি খরচ
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গ্যাসের দাম বেড়েছে এবং সার উৎপাদন ও সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উন্নয়নশীল দেশের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। আর উৎপাদন কমলে স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের দাম বাড়বে।

গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতি
সারের মূল উপাদান নাইট্রোজেন ও ফসফেট এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে। ইউরিয়া, যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সার, তার সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ইউরিয়া বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশই এখন ঝুঁকিতে। আফ্রিকার মতো দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা ইতিমধ্যে বড় সংকটে পড়েছে।
কৃষকদের উদ্বেগ ও বাস্তবতা
ভারতের এক কৃষক জানিয়েছেন, সরকার ভর্তুকি না দিলে ছোট কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক কৃষক এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় ইতিমধ্যে চাষাবাদ শুরু হয়ে গেছে। সময়মতো সার না পেলে ফসলের শুরুতেই ক্ষতি হবে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলবে।

বাজার পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বর্তমানে সারের দাম আগের মতো অত বেশি না হলেও কৃষিপণ্যের দাম কম থাকায় কৃষকদের লাভের সুযোগ কমে গেছে। ফলে অনেকেই কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন বা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
এর ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিকল্প সরবরাহে সীমাবদ্ধতা
চীন ও রাশিয়া বড় উৎপাদক হলেও তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এছাড়া যুদ্ধ শেষ হলেও নিরাপত্তা ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে
আফ্রিকার অনেক কৃষক মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইতিমধ্যে সেখানে সার সংকট দেখা দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র কিছুদিন সার প্রয়োগে দেরি হলে ফসলের উৎপাদন প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
সমাধানের পথ ও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ভর্তুকি বাড়ানো, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে জৈব সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে হবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। এতে ভবিষ্যতে এমন সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।
খাদ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা
এই সংকট আবারও দেখিয়ে দিল, বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা কতটা নাজুক। স্থিতিশীল সার সরবরাহ ছাড়া খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















