মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে দেশের আমদানি ব্যয়ে। চলতি বছরেই বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির খরচ প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বর্তমানে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বাড়তে থাকলে এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের মোট অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। হিসাব অনুযায়ী, এটি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ব পরিস্থিতির ধাক্কা ও পুরোনো ক্ষত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি বারবার জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় সংকট তৈরি করেছিল। সেই সময়ের নীতিগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি অর্থনীতি। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতা এবং জ্বালানি খাতে ধীরগতির পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন শঙ্কা
বর্তমান সংঘাতের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানি সক্ষমতার সময়কাল কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে বাড়তি আমদানি ব্যয় টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে তেল আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে, যা বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু তেলবাহী জাহাজ বিলম্বিত হয়েছে, যদিও সীমিত পরিসরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহেও সংকট দেখা দিয়েছে। ডিজেল আমদানির একটি বড় অংশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। একই সময়ে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সরকারকে বেশি দামে খোলা বাজার থেকে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সার কারখানা বন্ধ হওয়া এবং পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং বেড়েছে, আর জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানিও অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে না।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধীরগতি
এই সংকটের মধ্যেও বিকল্প জ্বালানির দিকে অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বড় পরিমাণে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক কম। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















