গ্যাস ও ডিজেলের একযোগে ঘাটতি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাত এখন একটি দ্বিমুখী সংকটের মুখে। একদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির অবরোধে ডিজেল আমদানি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই দুই জ্বালানির একযোগে ঘাটতিতে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পোশাক খাত এখন চরম চাপে। বিদ্যুৎ কাটা প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় দ্বিগুণ। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভারের শিল্প বেল্টে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেছে। অনেক কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৬০ শতাংশে চলছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি জ্বালানি সরবরাহ আরও কমে, কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এবং রপ্তানি এর মারাত্মক মাশুল গুনবে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, গ্যাস বিভ্রাটের সময় পোশাক কারখানাগুলো জেনারেটর চালাতে ডিজেল ব্যবহার করত। কিন্তু এখন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ফিলিং স্টেশনগুলোতে দৈনিক বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ায় পর্যাপ্ত ডিজেলই পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ তিন থেকে চার গুণ বেশি। অর্থাৎ যে কারখানা জেনারেটরে চলছে, তার উৎপাদন খরচ প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতি ইউনিট পোশাকে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট অতিরিক্ত খরচ পড়ছে। এই বাড়তি খরচ সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে মূল্য আলোচনায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করছে। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারিতে আরএমজি রপ্তানি আগের মাসের তুলনায় ১৩.২১ শতাংশ কমেছে।
শিপিং সংকটে ইউরোপগামী পণ্যের ঘুরপথ
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি শিপিং সংকটও পোশাক শিল্পকে চাপে ফেলছে। হুথি হামলার কারণে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইউরোপগামী প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাচ্ছে, যা সাধারণ রুটের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় নেয়। এই দীর্ঘ পথের কারণে শিপিং ফ্রেইট রেট বেড়েছে এবং বিমার প্রিমিয়ামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অতিরিক্ত লজিস্টিক খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতামূলকতাকে আঘাত করছে। থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষজ্ঞ মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের করণীয় হলো পণ্য ও বাজার বৈচিত্র্য আনা, ব্যবসার খরচ কমানো, বন্দর জট নিরসন করা এবং একটি সমন্বিত লজিস্টিক পরিকল্পনা তৈরি করা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, অতীতের প্রতিটি সংকটে যেমন কোটা বাতিল, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ও করোনা মহামারীতে পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু এবারের একযোগে বহুমুখী সংকট সামলানো তুলনামূলক বেশি কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















