এক বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ২০২৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষত এখনো শুকায়নি মিয়ানমারে। রাজধানী নেপিদো থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক শহর মান্দালয়—সবখানেই পুনর্গঠনের চিত্র অসম্পূর্ণ, ধীর আর বেদনাদায়ক। কোথাও নতুন করে গড়ে ওঠার চেষ্টা, আবার কোথাও ধ্বংসস্তূপই হয়ে আছে বাস্তবতার প্রতীক।
ধীরগতির পুনর্গঠন, এখনো ঝুলে আছে সেতুর ধ্বংসাবশেষ
ইরাবতী নদীর ওপর ঐতিহাসিক আভা সেতুর ভাঙা অংশ এখনো পুরোপুরি সরানো হয়নি। কিছু অংশ সরানো হলেও অনেক স্প্যান এখনো নদীর ওপর ঝুলে আছে। ভূমিকম্পের পর যেসব মানুষ গৃহহীন হয়েছিল, তারা এই নদীতেই দিন কাটিয়েছে—সে স্মৃতি এখনো তাজা।
ম্যান্ডালয়ের দিকে যাওয়া সড়কের বড় ফাটলগুলো ভরাট করা হয়েছে এবং আংশিকভাবে নতুন করে পিচঢালাই করা হয়েছে। তবে সবকিছুই যেন অসম্পূর্ণভাবে এগোচ্ছে।
প্রাণহানির ভয়াবহতা এখনো মনে দাগ কেটে আছে

২০২৫ সালের ২৮ মার্চের ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে মিয়ানমারে তিন হাজার আটশর বেশি মানুষ মারা যায়। পাশের থাইল্যান্ডেও প্রাণ হারায় প্রায় নব্বই জন। এই বিপর্যয় শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের মনেও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
রাজধানী ও শহরে আংশিক উন্নয়ন
নেপিদোর প্রধান হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ধসে পড়া কংক্রিট ছাউনি নতুন করে হালকা কাঠামোয় তৈরি করা হয়েছে। এটি কিছুটা স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক পুনর্গঠন এখনো অসম্পূর্ণ।
মান্দালয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অধিকাংশ আবাসিক ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরানো হয়েছে। কিছু জায়গায় নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, আবার অনেক জায়গা এখনো ফাঁকা পড়ে আছে। প্রাসাদের চারপাশের হেলে পড়া টাওয়ারগুলো সোজা করা হয়েছে এবং নতুন করে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ চলছে।
ধর্মীয় স্থানে পুনর্গঠন ও স্মৃতির ভার
আমারাপুরার একটি প্যাগোডায় ভাঙা ইটের স্তূপের মাঝ থেকে উদ্ধার করা বুদ্ধ মূর্তিটি যত্ন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। আবার নাগায়ন প্যাগোডায় একসময় শুধু হাত-পা বেঁচে থাকা মূর্তিটি এখন সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছে।

অন্যদিকে, একটি গ্রামে রমজানের শেষ জুমার নামাজের সময় মসজিদ ধসে বহু মানুষ মারা যায়। এখনো সেখানে স্থায়ী মসজিদ নির্মাণের অনুমোদন মেলেনি। অস্থায়ী ত্রিপলের নিচেই নামাজ আদায় করছেন মানুষ।
মানুষের জীবনসংগ্রাম ও মানসিক ক্ষত
স্থানীয়রা বলছেন, অনেকেই ঘর পুনর্নির্মাণে এগিয়ে গেছেন, আবার কেউ কেউ এখনো কাজ আর জীবনের জন্য সহায়তার অপেক্ষায়। অর্থনৈতিক সংকট তাদের আরও কঠিন অবস্থায় ফেলেছে।
একজন ধর্মীয় নেতা বলেন, আকাশ ভেঙে পড়লে তা সবার ওপরই পড়ে—এই দুর্যোগও তেমনই। যতটুকু সম্ভব, নিজেদের সামর্থ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
ভূমিকম্পের এক বছর পরও মানুষের মনে ভয় কাটেনি। সামান্য শব্দেও অনেকে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। অনেকের কাছে সেই দিনের দৃশ্য এখনো যেন গতকালের মতোই স্পষ্ট।
পুনর্গঠন নয়, লড়াই এখনো চলমান
মিয়ানমারের এই চিত্র স্পষ্ট করে দেয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের বিষয় নয়। এটি মানুষের মন, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর দীর্ঘ লড়াই।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















