মধ্য প্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ভারতের জ্বালানি তেলের সমস্যার মধ্যে দেশটির সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের ওপরে ধার্য শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের এখনও আগের দামেই তেল কিনতে হবে।
কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে যে, লিটার প্রতি ভারতীয় মুদ্রায় ১০ টাকা করে শুল্ক কমানো হচ্ছে। এতদিন পেট্রলের ওপরে ভারতীয় মুদ্রায় ১৩টাকা করে ও ডিজেলের ওপরে ১০ টাকা করে শুল্ক নিত সরকার।
নতুন ঘোষণার ফলে পেট্রোলের ক্ষেত্রে তা তিন টাকায় ও ডিজেলের ক্ষেত্রে শূন্যে নেমে এল। এই সিদ্ধান্ত ১৫ দিন পরে পুনর্বিবেচিত হতে পারে বলেও সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। সেই প্রেক্ষিতে ভারতের তেল সংস্থাগুলিকে যাতে ক্রেতার ওপরে বাড়তি দাম চাপিয়ে না দিতে হয়, আবার তেলের দাম না বাড়ালে যাতে সংস্থাগুলিরও ক্ষতি না হয়, সেজন্যই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকার শুক্রবার এ-ও জানিয়েছে যে, জ্বালানি সংকটের ফলে লকডাউন ঘোষণা করা হতে পারে কী না, তা জানতে বহু মানুষ যে গুগল সার্চ করছেন, তার কোনো ভিত্তিই নেই। কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী তার এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে জানিয়েছেন, লকডাউনের আশঙ্কা পুরোটাই গুজব।
যদিও সরকার আশ্বস্ত করছে যে, দেশে যথেষ্ট পরিমাণে জ্বালানি তেল মজুত আছে, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ‘প্যানিক বাইয়িং’-এর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটাও স্বীকার করছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়।
ভারতের বিভিন্ন বড়-ছোট শহরের একাধিক পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে গাড়ির।

আসামে একটি পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন
মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে কমল আবগারি শুল্ক
মধ্য প্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
বিশ্বের একটি বড় অংশে তেল সরবরাহ হয় এই প্রণালী দিয়ে। এর ফলে বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতের তেল সংস্থাগুলিকে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এই সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ব তেল কোম্পানিও। তেলের দাম না বাড়ালে তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এই অবস্থায় যাতে দেশে তেলের খুচরো দাম, অর্থাৎ সাধারণ ক্রেতারা যে দামে তেল কেনেন, তা না বাড়ে, সেই দিকটা মাথায় রেখেই আবগারি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
পেট্রল ও ডিজেলে এক্সাইজ ডিউটি কমানো ওয়েল মার্কেটিং কোম্পানীগুলিকে স্বস্তি দেবে বলেই মত প্রকাশ করেছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
তবে অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা বিমানের জ্বালানিতে নতুন করে শুল্ক চাপানো হয়েছে।
প্রতি লিটার বিমান জ্বালানিতে এবার থেকে ভারতীয় মুদ্রায় ৫০ টাকা হারে এক্সাইজ ডিউটি দিতে হবে। তাই ভারতে বিমানভাড়া বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কলকাতার একটি এলপিজি পাম্পে অটো-রিকশার সারি
কোম্পানিগুলির ক্ষতি ভাগ করে নিতে চাইছে সরকার
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন যে অয়েল মার্কেটিং কোম্পানি বা ওএমসিগুলি বিক্রিত পেট্রোলের প্রতি লিটারে ২৪ টাকা ও ডিজেলের প্রতি লিটারে ৩০টাকা হারে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের ক্রমবর্ধমান দামকেই এর কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন তিনি।
তথ্য দেখাচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখ অপরিশোধিত তেলের ব্যারেলপ্রতি দামের চেয়ে বর্তমান দাম ৫০ শতাংশের কিছুটা বেশি।
এই শুল্ক হ্রাস করে ওএমসিগুলির ক্ষতির বোঝা সরকারও কিছুটা বহন করে বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ওএমসিগুলির ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বার্ষিক ক্ষতির ভার লাঘব করা সম্ভব হবে।
রেটিং সংস্থা আইআরসিএ-এর মতে, এক্সাইজ ডিউটিতে প্রতি ১ টাকা হ্রাসের ফলে ১৬,০০০ কোটি টাকা বার্ষিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সরকার।
তবে এই মুহূর্তে দেশের বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখাই সরকারের কাছে সবথেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব
কী বলছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়?
“আমাদের কাছে বাৎসরিক ২৬ কোটি টন অপরিশোধিত তেল শোধন করার ক্ষমতা রয়েছে। এই কারণেই এই বার্তা আমি দিতে চাই, কারণ দেশে প্যানিক বাইং-এর পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে,” ২৫ মার্চ বুধবার এক সাংবাদিক সম্মেলন থেকে এই বার্তা দেন পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা।
দেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা যখন মানুষের মধ্যে ঘনীভূত হচ্ছে, তখনই এই বার্তা দিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন তিনি।
এই ঘোষণার দুই দিন পরে ২৭শে মার্চ থেকে ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের উপর থেকে এক্সাইজ ডিউটি কমানোর ঘোষণা আসে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে।
২৭শে মার্চ মিজ. শর্মা আবারও আশ্বস্ত করেন যে, ভারতের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার রয়েছে।
তবে রান্নার গ্যাস বা এলপিজির ক্ষেত্রে সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।
সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, একাধিক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও গ্যাস সরবরাহ সুরক্ষিত রাখার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
“আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে জ্বালানি মজুত রয়েছে। একমাত্র গুজবের কারণেই পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে”, জানান মিজ. শর্মা।
মজুতদারদের বিরুদ্ধে যাতে যথাযথ পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার জন্য রাজ্য সরকারগুলিকে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

রান্নার গ্যাসের সিলিণ্ডারের জন্য লম্বা লাইন পড়ছে ভারতের অনেক শহরে
‘লকডাউনের কোনও সম্ভাবনা নেই’
জ্বালানি তেলের সংকটের মধ্যে দেশ জুড়ে গুগুল সার্চে ট্রেন্ড করছে লকডাউন। দেশের বহু নাগরিকই লকডাউনের আশঙ্কা করতে শুরু করেছিলেন। তবে এই ধারণাকে অমূলক বলেছেন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী।
“লকডাউনের আশঙ্কা সম্পূর্ণ গুজব ও মিথ্যা” একটি এক্স পোস্টে লেখেন তিনি।
“এরকম কোনও পরিকল্পনা ভারত সরকারের নেই” জানান মি. পুরী।
তবে আশ্বাস স্বত্বেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় এলপিজি সংকট বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। বহু মানুষ অভিযোগ করছেন যে, প্রায় চারগুণ দামে তাদের রান্নার গ্যাস কিনতে হচ্ছে কালোবাজার থেকে।
আবার এলপিজির সংকটের প্রভাব পড়েছে যানবাহনের ক্ষেত্রেও।
কলকাতার রাস্তায় লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি বলতে অনেকেরই ভরসা এলপিজি চালিত অটো- রিকশা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বহু গ্যাস পাম্পে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অটো-রিকশা।
কলকাতার একাধিক অটো-রিকশা চালক জানিয়েছেন, সব পাম্পে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। যে পাম্পে পাওয়া যাচ্ছে সেখানে যোগান সীমিত। এর ফলে ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন একাধিক অটোচালক।
চলতি সংকটের মোকাবিলা করতে জ্বালানি রপ্তানিজনিত কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই বিধিনিষেধ চালু হবে না বলে জানানো হয়েছে।
বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
প্রত্যুষ রায় 



















