ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের উত্তর উপকূলে প্রতিদিনই সমুদ্র যেন একটু একটু করে ভূমি গিলে খাচ্ছে। স্থানীয় জেলে আহমদ সারিফের মতো হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা এখন এই ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়েছে। একসময় ৪০০ হেক্টরের বেশি বিস্তৃত ছিল যে গ্রাম, তার বড় অংশই এখন পানির নিচে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষকে বারবার ঘরের মেঝে উঁচু করতে হচ্ছে, কিন্তু তাতেও রক্ষা মিলছে না।
উপকূল ধস ও জলবায়ু সংকট
জাভার উত্তর উপকূলে ভূমিধসের হার বছরে ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত, যা বিশ্বের অনেক জায়গার তুলনায় বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—অনিয়মিত বৃষ্টি, প্রবল বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে প্রায় ৫৪৪ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ ক্ষতি হয়েছে। কৃষি, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

৮০ বিলিয়ন ডলারের ‘জায়ান্ট সি ওয়াল’ পরিকল্পনা
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সমুদ্রপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রপ্রাচীর। নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় ২০ বছর সময় লাগতে পারে।
এই প্রকল্প শুধু বন্যা প্রতিরোধ নয়, বরং টোল সড়ক, রেললাইন, সৌরবিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানির সংস্থানসহ বহুমুখী অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
অর্থনীতি ও শিল্পে প্রভাব
জাভা দ্বীপ ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির কেন্দ্র, যেখানে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ বসবাস করে। শুধু উত্তর উপকূলই দেশের মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখে। কিন্তু উপকূল ধস ও বন্যার কারণে এই অর্থনৈতিক শক্তি এখন হুমকির মুখে।
প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কারণ বারবার পানি সরাতে হচ্ছে। কাঁচামাল পৌঁছাতে পারছে না, আবার পণ্য সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটছে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

জীবিকা হারাচ্ছে মানুষ
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে জীবিকার ওপর। অনেকেই চিংড়ির ঘের হারিয়েছে, মাছের আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাছ ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে। ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তবে অধিকাংশের পক্ষে অন্যত্র গিয়ে নতুন করে শুরু করা সম্ভব নয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট উৎস এখনও নির্ধারিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সমুদ্রপ্রাচীর নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার বন্ধ করা এবং শহর পরিকল্পনা উন্নত করা জরুরি। কারণ অতিরিক্ত পানি উত্তোলনই ভূমিধসের অন্যতম কারণ।

সমালোচনা ও সন্দেহ
কিছু বিশেষজ্ঞ এই প্রকল্প নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি মূল সমস্যার সমাধান নয়, বরং সাময়িক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ভূমিধস বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সমুদ্রপ্রাচীরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এছাড়া প্রাচীরের ভেতরে পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনাকেও অনেকে নিরাপদ সমাধান হিসেবে দেখছেন না।
লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও উপকূলের মানুষ হাল ছাড়তে নারাজ। নিজের ভিটেমাটি রক্ষার জন্য তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আহমদ সারিফের মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন, যত কঠিনই হোক, এই ভূমি বাঁচানোর চেষ্টা থামানো যাবে না।
তাদের কাছে এটি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, এটি তাদের অস্তিত্ব ও ভালোবাসার স্থান।








সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















