মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মুদ্রা দ্রুত দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর মুদ্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে।
মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা: এশিয়ার ওপর চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার এক মাস পরও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কাটেনি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। ফিলিপাইনের পেসো ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি বৈঠক করেও সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে, যা বাজারে নেতিবাচক বার্তা দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা গত এক মাসে প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে এবং ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ডের বাথ ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। জাপানি ইয়েনও ডলারের বিপরীতে ১৬০ ছাড়িয়েছে, যা বড় ধরনের পতনের ইঙ্গিত দেয়।
ডলারের শক্তিশালী অবস্থান
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ডলারের চাহিদা বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা ডলারকে নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ডলার সূচকও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে নরওয়ে, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর মুদ্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে জ্বালানি সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা মুদ্রার স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখছে।

জ্বালানি দামের উল্লম্ফন ও এর প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে যায়, যা ইউক্রেন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। বর্তমানে দাম কিছুটা কমলেও আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি রয়েছে।
জ্বালানি দামের এই বৃদ্ধি সরাসরি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। কারণ তেল থেকে উৎপাদিত পণ্য অসংখ্য শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে এর প্রভাব প্রায় সব খাতেই ছড়িয়ে পড়ছে।
এশিয়ার দুর্বলতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা
এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় দাম বাড়লে তাদের অর্থনীতি চাপে পড়ে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় অনেক দেশ সুদের হার বাড়াতে দ্বিধায় রয়েছে। ফলে মুদ্রার ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্য অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে কঠোর নীতি নিচ্ছে, সেখানে এশিয়ার অপেক্ষাকৃত নরম অবস্থান মুদ্রা বিক্রির প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর সুবিধা
জ্বালানি সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো লাভবান হচ্ছে। তাদের বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এসব দেশ সুদের হার বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে, যা তাদের মুদ্রাকে আরও শক্তিশালী করছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা এক বছরের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে উদীয়মান এশিয়ার প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১.৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৩.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন, সুদের হার বৃদ্ধি এবং পর্যটন ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর এশিয়ার দেশগুলো মুদ্রা দুর্বলতা ও মূল্যস্ফীতির দ্বৈত চাপের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এই বৈষম্য ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















