যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানে চলমান সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। তবে একই সময়ে ইসরায়েলের বিমান হামলা ও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
সংঘাতের বিস্তার ও সাম্প্রতিক হামলা
ইসরায়েল শনিবার জানায়, তারা তেহরানে হামলা চালাচ্ছে এবং ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে। একদিন আগে সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর।
গালফ অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

ইয়েমেন ও হুথিদের সম্ভাব্য ভূমিকা
ইসরায়েল জানায়, ইয়েমেন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে তারা শনাক্ত করেছে। যদিও ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এখনো সরাসরি এই যুদ্ধে সক্রিয় হয়নি।
হুথিরা জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত—বিশেষ করে যদি নতুন মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয় বা লোহিত সাগর থেকে ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়।
রুবিওর বক্তব্য ও মার্কিন পরিকল্পনা
ফ্রান্সে জি-৭ বৈঠকের পর মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বা তার আগেই এগোচ্ছে এবং “মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই” অভিযান শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্থলবাহিনী ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কিছু সেনা মোতায়েন রাখা হয়েছে।
![]()
মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হাজার হাজার মেরিন সেনা পাঠিয়েছে, যাদের একটি অংশ বড় আকারের যুদ্ধজাহাজে করে শিগগিরই পৌঁছাবে। পাশাপাশি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এয়ারবোর্ন সেনাও পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলো যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব ও ন্যাটো প্রসঙ্গ
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে, কারণ অনেক দেশ সরাসরি অংশ নেয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মিত্রদের এই অবস্থান ন্যাটোর ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “তারা যদি আমাদের পাশে না থাকে, তাহলে আমরা কেন তাদের পাশে থাকব?”
অর্থনৈতিক প্রভাব ও জ্বালানি বাজার
যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ১১২ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামও বেড়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৭.১৭ ডলারে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ ও চাপ
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী এবং কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে, ইরান দাবি করেছে—এমন কোনো আলোচনা শুরু হয়নি।
ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ১০ দিনের সময়সীমা বাড়িয়েছেন, অন্যথায় তাদের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ইরানে ক্ষয়ক্ষতি ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ইরানের জানজান শহরে একটি আবাসিক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন। তেহরানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েল দুটি ইস্পাত কারখানা ও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এসব হামলার “কঠোর মূল্য” দিতে হবে।

মিসাইল হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যা ইসরায়েলের প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনেও শনিবার ভোরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠছে। সামরিক প্রস্তুতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে এই সংঘাত বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















