ইরানে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দেশটির শাসকগোষ্ঠী এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হতে পারে।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রবাসীর অভিজ্ঞতা
নামদার বাঘাই-ইয়াজদি, যিনি দেশের বাইরে থাকেন, চলতি বছরে খুব কমই তেহরানে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন। সম্প্রতি একটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের এলাকার কাছাকাছি আঘাত হানার পর কয়েকদিন তিনি জানতেই পারেননি, তার স্বজনরা বেঁচে আছেন কি না।
তার অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। জানুয়ারির বিক্ষোভের পর থেকে দেশের বাইরে থাকা বহু ইরানি তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন।
বারবার ইন্টারনেট বন্ধ, এবার আরও কঠোর
জানুয়ারির বিক্ষোভের পর সরকার দু’বার পুরো ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। দ্বিতীয়বার ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া এই বন্ধ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ ও কঠোর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাময়িক নয়—বরং দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ীও হতে পারে।
পুরনো কৌশল থেকে নতুন ব্যবস্থায় পরিবর্তন
গত প্রায় দুই দশক ধরে সরকার বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট বন্ধ করে আসছে। আগে তারা মূলত BGP রুট বন্ধ করে দিত, ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে কোনো ডেটা চলাচল সম্ভব হতো না।
কিন্তু এবার কৌশল বদলেছে। সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে সরকার একটি নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক চালু করেছে।
‘ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’: নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল জগৎ
এই নতুন ব্যবস্থার নাম ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (NIN)। এটি এমনভাবে তৈরি, যাতে দেশের ভেতরে ইন্টারনেট চললেও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ প্রায় বন্ধ থাকে।
এখানে বিদেশি সংবাদমাধ্যম বা ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার নেই। সরকার অনুমোদিত অ্যাপগুলোতে নজরদারি চালানো হয়, যেখানে বট ব্যবহার করে সরকারবিরোধী মতামত খোঁজা হয়।
নির্বাচিতদের জন্য উন্মুক্ত, সাধারণের জন্য বন্ধ
পুরো ইন্টারনেট বন্ধ না করে সরকার নিজে সংযোগ চালু রেখেছে। অর্থাৎ, তারা চাইলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে।
এই ব্যবস্থার ফলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য ইন্টারনেট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন নেটওয়ার্ক বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তির লড়াই: ফাঁকফোকর খুঁজছেন নাগরিকরা
তবে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি অটুট নয়। প্রযুক্তিতে দক্ষ কিছু ইরানি নানা উপায়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিছু সফটওয়্যার বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকদের আইপি ব্যবহার করে ইন্টারনেট ট্রাফিককে সাধারণ ভিডিও কলের মতো দেখাতে পারে। জানুয়ারিতে VPN সেবা Psiphon-এর ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ।
তবে সরকারপন্থী এলিটদের জন্য যে সীমিত ইন্টারনেট চালু ছিল, সেটিও মাঝে মাঝে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে—যা নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়ি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট: গোপন পথ
স্থানীয় নেটওয়ার্ক এড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি উপায় হলো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, যেমন স্টারলিংক। দেশে গোপনে হাজার হাজার এমন ডিভাইস প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরে ইরান থেকে বের হওয়া বেশিরভাগ ভিডিও ফুটেজ এই পথেই এসেছে।
ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা
তবে এসব পদ্ধতি সহজ নয়। প্রযুক্তিগতভাবে জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সবার নাগালে নেই। বিশেষ করে স্টারলিংক ডিভাইস রাখা ধরা পড়লে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
ফলে ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকই এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো ব্যবহার করতে পারছেন।
শাসকদের লক্ষ্য: চলমান দেশ, অন্ধকারে জনগণ
সরকারের মূল লক্ষ্য হলো—দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসন সচল রাখা, কিন্তু সাধারণ মানুষকে তথ্যের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা।
ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক সেই লক্ষ্য পূরণে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















