ব্রিটেনের দুগ্ধ খাত এক অদ্ভুত সংকটে পড়েছে। উৎপাদন বাড়লেও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় খামারিরা দুধ বিক্রি করে লাভ তো পাচ্ছেনই না, উল্টো লোকসান সামলাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদিত দুধ ফেলে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
উৎপাদন বাড়লেও দাম কমছে
চেশায়ারের এক খামারি জানান, কয়েক মাসের ব্যবধানে তার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে এক লিটার দুধ উৎপাদনের খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পুরো দেশে গত এক বছরে প্রায় ১৩ বিলিয়ন লিটার দুধ উৎপাদন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এই অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে গত সেপ্টেম্বর থেকে গড় দাম কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

অতিরিক্ত উৎপাদনের পেছনের কারণ
গত গ্রীষ্মে খরা পরিস্থিতির কারণে খামারিরা গরুকে বেশি পুষ্টিকর খাবার দিতে বাধ্য হন, যা সাধারণত শীতকালে দেওয়া হয়। ফলে গরুগুলো আগের তুলনায় বেশি দুধ দিতে শুরু করে। একই সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে দুধের চাহিদা কমছে। আগের মতো দুধ নির্ভর খাবারও কম খাওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন বেড়েছে
বর্তমানে কম সংখ্যক গরু দিয়েই বেশি দুধ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। উন্নত প্রজনন, স্বয়ংক্রিয় দুধ সংগ্রহ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে একটি গরু এখন সত্তরের দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দুধ দেয়। ফলে ছোট খামার থেকেও বড় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতা
অতিরিক্ত দুধকে মাখন, পনির বা দুধগুঁড়ায় রূপান্তর করার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো ব্রিটেনে নেই। ফলে বাড়তি দুধ বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্য অনেক দেশ যেখানে অতিরিক্ত দুধ সহজেই প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, সেখানে ব্রিটেন পিছিয়ে।
খামারিদের সংকট ও ঝুঁকি
কিছু খামারি লোকসান সামাল দিতে গরু জবাই করে গরুর মাংস বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন, কারণ মাংসের দাম এখন তুলনামূলক বেশি। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কম গরু থাকলে রোগব্যাধির ঝুঁকিও বাড়ে, যা পুরো খামারকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
বাজারের অস্থিরতা ও ব্রেক্সিটের প্রভাব
বিশ্ববাজারেও দুধের দাম কমছে। ইউরোপ ও আমেরিকায়ও দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্য বাধা, যা ব্রিটেনের জন্য অতিরিক্ত দুধ রপ্তানি করা আরও ব্যয়বহুল ও ধীর করে তুলেছে।

খামারের সংখ্যা কমছে
দুধের দাম কম রাখা নিয়ে সুপারমার্কেটগুলোর প্রতিযোগিতাও খামারিদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ব্রিটেনে দুগ্ধ খামারের সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমে এখন প্রায় ৭ হাজারে নেমে এসেছে।
রপ্তানিতে আশার আলো
তবে এই খাতের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রিটিশ দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে। গত বছর রপ্তানি রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে। যদি দেশটি আরও বেশি প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে মাখন, পনির ও দইয়ের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















