বৈরুত ও তেল আবিব
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কার্যকর হওয়ার পরও লেবাননে ইসরায়েল সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। বুধবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের বিমান হামলায় আড়াই শতাধিক মানুষ নিহত এবং এক হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে হিজবুল্লাহও স্বল্প বিরতির পর উত্তর ইসরায়েলে আবার রকেট হামলা শুরু করেছে। এতে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বৈরুতে একের পর এক বিস্ফোরণ
বুধবার বিকেলে বৈরুতজুড়ে টানা কয়েকটি বড় বিস্ফোরণে আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে বৈরুত, বেকা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর শতাধিক কমান্ডকেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনায় সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। তবে লেবানের বিভিন্ন সূত্র বলছে, এসব হামলার বড় অংশই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও লেবানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, মোট ২৫৪ জন নিহত এবং ১,১০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। শুধু বৈরুতেই নিহত হয়েছেন ৯১ জন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধবিরতির ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতি তার দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে বলেছেন, লেবানন ওই যুদ্ধবিরতির অংশ নয় এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারাও একই অবস্থান জানিয়েছেন।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তারা শুরুতে হামলা বন্ধ রেখেছিল, কারণ তাদের জানানো হয়েছিল যে লেবাননও যুদ্ধবিরতির আওতায় আছে। কিন্তু এরপর ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা ও ব্যাপক প্রাণহানির পর তারা আবার রকেট ছোড়ে। সংগঠনটির বক্তব্য, দেশ ও জনগণের ওপর হামলা চলতে থাকলে তাদের জবাবও চলবে।
মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর
বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকা পড়েন। উদ্ধারকর্মীরা ভাঙা ভবনের ওপর থেকে বৃদ্ধ মানুষকে সরিয়ে আনেন। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় মোটরসাইকেলে করে আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। শহরের একটি বড় হাসপাতাল সব রক্তের গ্রুপের রক্তদানের আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান এই হত্যাযজ্ঞকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন।

একজন বাসিন্দা বলেছেন, বিস্ফোরণের শব্দে জানালার কাচ উড়ে গেছে, তিনি রাতে ঘুমাতেও ভয় পাচ্ছেন। তার ভাষায়, তিনি যেন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাস করছেন। এই বক্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির গভীর মানসিক চাপও তুলে ধরে।
দক্ষিণ লেবানন বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কা
একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলার পর দক্ষিণ লেবাননের সঙ্গে দেশের অন্য অংশের সংযোগ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, লিতানি নদীর ওপর থাকা এই সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য শেষ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগগুলোর একটি ছিল। ইসরায়েল এর আগে জানিয়েছে, সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলকে তারা বাফার জোন হিসেবে রাখতে চায়। এর ফলে হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বেসামরিক অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে।
বর্তমানে লেবানের প্রায় ১৫ শতাংশ ভূখণ্ডের জন্য সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি আছে। দক্ষিণাঞ্চল ও বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠের বহু মানুষ ঘরছাড়া। বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। অনেকেই যুদ্ধবিরতির আশায় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কিন্তু নতুন হামলা সেই আশাও ভেঙে দিয়েছে।
কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে

লেবানের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ লেবাননকে যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর নেতারাও সতর্ক করেছেন, হামলা চলতে থাকলে পুরো সমঝোতাই ঝুঁকিতে পড়বে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কড়া জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সংকটের বড় ছবি
এই যুদ্ধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যেও লেবানন কার্যত যুদ্ধের বাইরে যেতে পারেনি। যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণ এবং বেসামরিক মানুষের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠছে। লেবানের সাধারণ মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি চাইছে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি, যাতে অন্তত তারা বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা ফিরে পায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















