০৫:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
হাঙ্গেরির ভোটে রোমা ফ্যাক্টর, অরবানের ভাগ্য নির্ধারণে এবার প্রান্তিকদের চোখে চোখ চাঁদ দেখে স্তব্ধ আর্টেমিস টু দল, বিজ্ঞান ছাপিয়ে মহাকাশযাত্রায় উথলে উঠল বিস্ময় কাবুলের শোকভূমি: পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রাণঘাতী হামলায় স্বজনহারা মানুষের অন্তহীন আর্তনাদ সোনার দামে একদিনেই বড় পতন, ভরিতে কমল ৪ হাজার ৪৩২ টাকা সাবেক এমপি সাফুরা বেগম রুমী ঢাকায় গ্রেপ্তার যাত্রাবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশে বাড়তে পারে বছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় চীনা পণ্যে শুল্কের চাপ বাড়তেই শুরু নতুন কারসাজি, হিসাব বদলে কমানো হচ্ছে আমদানি খরচ কালবৈশাখীর শঙ্কা ঢাকা-সহ পাঁচ বিভাগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগ নেতা পিটিয়ে হত্যা

নাসা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়েছে, কিন্তু আড়ালে এর বিজ্ঞান ভয়াবহ বিশৃঙ্খলায়

আর্তেমিস-২ এর চাঁদ ঘিরে যাত্রা, যা শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা, মহাকাশ থেকে তোলা আমাদের পৃথিবীর নতুন কিছু বিস্ময়কর ছবি এনে দিয়েছে।

এই ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয়, ১৯৭২ সালে সর্বশেষ যখন মহাকাশচারীরা চাঁদের কাছাকাছি গিয়েছিলেন, তারপর থেকে পৃথিবী যেমন অনেক বদলে গেছে, নাসাও তেমন বদলেছে। বাজেট কমানো, বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখন সেই বিজ্ঞানকেই হুমকির মুখে ফেলছে, যে বিজ্ঞান মহাকাশ অনুসন্ধানকে অনুপ্রাণিত করে এবং সম্ভবও করে তোলে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবে নাসার বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় অর্ধেক কাটছাঁটের কথা বলা হয়েছে। আমরা হয়তো এখনও চাঁদের দিকে ছুটতে পারব, কিন্তু নিজের পৃথিবীকে বোঝার ক্ষমতা হারাতে বসেছি।

ছোটবেলা থেকেই আমি নাসায় কাজ করতে চাইতাম। বহু বছর পড়াশোনার পর শেষ পর্যন্ত গবেষণা পদার্থবিদ হিসেবে সেখানে কাজের সুযোগ পাই। কিন্তু গত মাসে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর ফেডারেল সরকার ছেড়ে যাওয়া ১০ হাজারের বেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের পিএইচডিধারীর সঙ্গে আমিও সেই দলে যোগ দিয়েছি। একে চাইলে বলা যায়, আমেরিকার মেধাবী গবেষকদের বড় বহির্গমন। ক্যানসার, কৃষি আর আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা হঠাৎই রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, অথবা অন্তত তার শিকার হয়েছেন।

আমি নাসার গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজে ঠিকাদারি ভিত্তিতে এবং পরে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ১০ বছর কাজ করেছি। আমার গবেষণার বিষয় ছিল সবার সেরা গ্রহ—পৃথিবী। বৃষ্টি আর মেঘ নিয়ে উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করা, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মডেল তৈরি করা ছিল আমার কাজ। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার এই কাজই আমাকে ও আমার সহকর্মীদের এমন এক প্রশাসনের নিশানায় নিয়ে আসে, যারা বিশেষভাবে তেল ও গ্যাস শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী। মার্চে এসে বিশৃঙ্খলাটা যেন স্থায়ী হয়ে দাঁড়ায়, আর আমাদের কাজের ওপর আক্রমণও বাড়তেই থাকে। তখনই বুঝেছিলাম, চলে যাওয়ার সময় হয়েছে।

US Congress narrowly rejects war powers resolution to halt Trump's Iran  attacks - France 24

সরকারি কাটছাঁটের প্রথম ধাক্কা থেকে আমার দল কোনোমতে বেঁচে গেলেও মে মাসে হঠাৎ কোনো পরিষ্কার কারণ ছাড়াই নিউইয়র্ক শহরের অফিস ছাড়তে বলা হয়। অফিসের সোফায় বসে কাজ চালানোর বাস্তবতায় মানিয়ে নিয়ে আমি অনুদানের প্রস্তাব লিখতে থাকি। এর কিছু প্রস্তাবকে “নির্বাচনযোগ্য” বলা হয়েছিল, অর্থাৎ অর্থ থাকলে সেগুলো অনুমোদিত হতো। অন্য কিছু প্রস্তাব যেন অদৃশ্য গহ্বরে হারিয়ে যায়। টাকা কোথায়, আমরা জানতাম না।

পরে সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও পরিবহনবিষয়ক কমিটিতে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের একটি প্রতিবেদনে আমাদের সন্দেহের সত্যতা মেলে। সেখানে বলা হয়, কংগ্রেস চূড়ান্ত বরাদ্দ অনুমোদন করার আগেই সংস্থাটি বেআইনিভাবে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত কম অর্থায়নের বাজেট কার্যকর করতে শুরু করেছিল। জানুয়ারিতে কংগ্রেস এমন একটি বাজেট পাস করে, যাতে নাসার বিজ্ঞান খাতের অর্থের বড় অংশই পুনর্বহাল হয়। কিন্তু তাতে আমার মতো বহু গবেষকের জন্য অর্থ সহজলভ্য হয়ে যায়নি।

কেউ বলছিলেন, পরিস্থিতি হয়তো ভালো হবে। আবার কেউ বলছিলেন, আরও খারাপ হতে পারে। সামনে কী আছে, কেউ নিশ্চিত জানত না। আমাদের কাজের প্রকৃতি বিবেচনায় এই অনিশ্চয়তা ছিল গভীরভাবে বিদ্রূপাত্মক।

অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তাই শুধু আমাদের কষ্ট দেয়নি। ২০২৫ সালের মার্চে সংস্থাটি প্রধান বিজ্ঞানীর পদ তুলে দেয়। সর্বশেষ এই পদে ছিলেন একজন জলবায়ু গবেষক। এতে পৃথিবীবিষয়ক গবেষণার জন্য খারাপ ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়। সংস্থাজুড়ে বিভিন্ন বৈঠকে চাঁদ আর মঙ্গলের কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু আমাদের নিজের গ্রহের কথা খুব কম। যেন সৌরজগতের একমাত্র বাসযোগ্য পৃথিবীটি ছিল কেবল পরের চিন্তা।

সূর্য, নক্ষত্র, অন্য গ্রহ ও উপগ্রহ নিয়ে কাজ করা গবেষকরাও কাটছাঁট আর অস্থিরতার মুখে পড়েন। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গ্রন্থাগার বন্ধ হয়ে যায়, সঙ্গে আরও বহু গবেষণাগারও, যাকে বলা হয়েছিল “সমন্বয়”। যেসব অভিজ্ঞ বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বকে আমরা চিনতাম, বিশ্বাস করতাম, তাঁরাও এই অস্থিরতার মধ্যে আমাদের পথ দেখাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। অথচ তাদের ঊর্ধ্বতনদের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান রক্ষার চেয়ে ইমেইলের স্বাক্ষরে সর্বনাম আছে কি না, তা দেখায় বেশি।

নাসা কী, নাসায় বাংলাদেশিরা কেমন ভূমিকা রাখছেন?

আমার জন্য শেষ ধাক্কা আসে মার্চ মাসে, যখন নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে আমাদের কাজকে খাটো করে মন্তব্য করেন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নাসার বিজ্ঞানীরা “রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত” বিষয় নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করলে তা নাসার বৃহত্তর মিশনের জন্য সহায়ক নয়।

এখন আর কেউ আমার মতামতকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরকারি অবস্থান ভেবে ভুল করবেন না, তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি: প্রশাসন যা-ই বলুক, জলবায়ুবিজ্ঞান নিজে থেকে রাজনৈতিক নয়। আমার সঙ্গে কাজ করা কেউই নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রাখতেন না, এমন ইচ্ছাও ছিল না। আমাদের কাজ ছিল প্রকৃতির নিয়ম বোঝা, আর সেই নিয়ম ক্ষমতায় কে আছে তার ওপর নির্ভর করে বদলে যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে কী করা উচিত, তা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু নীতি নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে প্রশাসন বরং বিজ্ঞানের ওপরই আঘাত হানার পথ বেছে নিয়েছে। তারা কার্যত জাতীয় জলবায়ু মূল্যায়ন বন্ধ করে দিয়েছে, জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের গবেষকদের ছাঁটাই করেছে, আর নাসার বিজ্ঞানীদের ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। এখন তারা আবহাওয়া ও জলবায়ুবিজ্ঞানের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান, জাতীয় বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণা কেন্দ্রকেও ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

সত্যটা হলো, আমরা ইতিমধ্যেই জলবায়ু বিপর্যয়ের শুরুর পর্যায়ে আছি। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে বসন্তের তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। কলোরাডো নদী অববাহিকায় আগেই থাকা তীব্র খরা আরও খারাপ হচ্ছে, কারণ রকি পর্বতমালায় তুষারপাত রেকর্ড পরিমাণ কম। উচ্চ তাপমাত্রা, শুকনো উদ্ভিদ আর কম বৃষ্টিপাত মিলিয়ে সামনে ভয়াবহ দাবানলের মৌসুম আসতে পারে।

How Exactly Does Carbon Dioxide Cause Global Warming? – State of the Planet

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বড় ধরনের কাটছাঁট না এলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কেবলই বাড়বে। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হবে, অনেক পাড়া বীমার অযোগ্য কিংবা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে, খাদ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধাক্কা অস্থিরতা তৈরি করবে। শেষ পর্যন্ত নাসার প্রশাসককেও হয়তো স্বীকার করতে হবে, পরিস্থিতি সত্যিই বিপর্যয়কর।

তবু পৃথিবী নিয়ে নাসার গবেষণায় বিস্ময়ের ঘাটতি নেই। এমন উপগ্রহ আছে, যা সাগরকে অপূর্ব রঙে দেখতে দেয়। অতীতের জলবায়ুর খণ্ডিত রেকর্ড জোড়া লাগানো হয়েছে। উচ্চ-রেজোলিউশনের মডেলে দেখা যায় ধোঁয়া আর দূষণ কীভাবে বায়ুমণ্ডলে ঘুরে বেড়ায়। এই অদ্ভুত সুন্দর জগতে বেঁচে থাকতে পেরে আমি মুগ্ধ, অভিভূত এবং কৃতজ্ঞ। আরও জানতে ইচ্ছা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মানুষ বিনা খরচায় এই জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পায় নাসার কারণেই। সরকারি অর্থে পরিচালিত বিজ্ঞানের প্রতিশ্রুতি সবসময়ই ছিল এটাই—সবার জন্য আবিষ্কার, বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে আরও বড় আর ভালো কিছু হয়ে ওঠার অঙ্গীকার।

নাসা এখনও অনুপ্রেরণার সেই ধারণা ধরে রাখতে চায়। হয়তো আর্তেমিস-২ নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরলে নতুন এক প্রজন্ম উপর থেকে পৃথিবীকে দেখার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে নাসা বৈজ্ঞানিক ধারাটিকেই সংকুচিত করছে, আর আমাদের নিজের গ্রহকে দেখা ও বোঝার ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। জলবায়ুবিজ্ঞান যে উপকার দিতে পারে, তা সবার প্রাপ্য—বর্তমানকে বোঝা, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করার সামর্থ্য, আর বদলে যেতে থাকা পৃথিবীকে জানার নিখাদ আনন্দ। বিজ্ঞান না থাকলে মহাকাশ থেকে দেখা পৃথিবীর সেই অসাধারণ ছবিগুলো কেবল সুন্দর ছবি হয়েই থাকে। আমাদের প্রাপ্য তার চেয়ে অনেক বেশি।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাঙ্গেরির ভোটে রোমা ফ্যাক্টর, অরবানের ভাগ্য নির্ধারণে এবার প্রান্তিকদের চোখে চোখ

নাসা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়েছে, কিন্তু আড়ালে এর বিজ্ঞান ভয়াবহ বিশৃঙ্খলায়

০৩:৩২:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

আর্তেমিস-২ এর চাঁদ ঘিরে যাত্রা, যা শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা, মহাকাশ থেকে তোলা আমাদের পৃথিবীর নতুন কিছু বিস্ময়কর ছবি এনে দিয়েছে।

এই ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয়, ১৯৭২ সালে সর্বশেষ যখন মহাকাশচারীরা চাঁদের কাছাকাছি গিয়েছিলেন, তারপর থেকে পৃথিবী যেমন অনেক বদলে গেছে, নাসাও তেমন বদলেছে। বাজেট কমানো, বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখন সেই বিজ্ঞানকেই হুমকির মুখে ফেলছে, যে বিজ্ঞান মহাকাশ অনুসন্ধানকে অনুপ্রাণিত করে এবং সম্ভবও করে তোলে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবে নাসার বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় অর্ধেক কাটছাঁটের কথা বলা হয়েছে। আমরা হয়তো এখনও চাঁদের দিকে ছুটতে পারব, কিন্তু নিজের পৃথিবীকে বোঝার ক্ষমতা হারাতে বসেছি।

ছোটবেলা থেকেই আমি নাসায় কাজ করতে চাইতাম। বহু বছর পড়াশোনার পর শেষ পর্যন্ত গবেষণা পদার্থবিদ হিসেবে সেখানে কাজের সুযোগ পাই। কিন্তু গত মাসে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর ফেডারেল সরকার ছেড়ে যাওয়া ১০ হাজারের বেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের পিএইচডিধারীর সঙ্গে আমিও সেই দলে যোগ দিয়েছি। একে চাইলে বলা যায়, আমেরিকার মেধাবী গবেষকদের বড় বহির্গমন। ক্যানসার, কৃষি আর আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা হঠাৎই রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, অথবা অন্তত তার শিকার হয়েছেন।

আমি নাসার গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজে ঠিকাদারি ভিত্তিতে এবং পরে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ১০ বছর কাজ করেছি। আমার গবেষণার বিষয় ছিল সবার সেরা গ্রহ—পৃথিবী। বৃষ্টি আর মেঘ নিয়ে উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করা, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মডেল তৈরি করা ছিল আমার কাজ। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার এই কাজই আমাকে ও আমার সহকর্মীদের এমন এক প্রশাসনের নিশানায় নিয়ে আসে, যারা বিশেষভাবে তেল ও গ্যাস শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী। মার্চে এসে বিশৃঙ্খলাটা যেন স্থায়ী হয়ে দাঁড়ায়, আর আমাদের কাজের ওপর আক্রমণও বাড়তেই থাকে। তখনই বুঝেছিলাম, চলে যাওয়ার সময় হয়েছে।

US Congress narrowly rejects war powers resolution to halt Trump's Iran  attacks - France 24

সরকারি কাটছাঁটের প্রথম ধাক্কা থেকে আমার দল কোনোমতে বেঁচে গেলেও মে মাসে হঠাৎ কোনো পরিষ্কার কারণ ছাড়াই নিউইয়র্ক শহরের অফিস ছাড়তে বলা হয়। অফিসের সোফায় বসে কাজ চালানোর বাস্তবতায় মানিয়ে নিয়ে আমি অনুদানের প্রস্তাব লিখতে থাকি। এর কিছু প্রস্তাবকে “নির্বাচনযোগ্য” বলা হয়েছিল, অর্থাৎ অর্থ থাকলে সেগুলো অনুমোদিত হতো। অন্য কিছু প্রস্তাব যেন অদৃশ্য গহ্বরে হারিয়ে যায়। টাকা কোথায়, আমরা জানতাম না।

পরে সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও পরিবহনবিষয়ক কমিটিতে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের একটি প্রতিবেদনে আমাদের সন্দেহের সত্যতা মেলে। সেখানে বলা হয়, কংগ্রেস চূড়ান্ত বরাদ্দ অনুমোদন করার আগেই সংস্থাটি বেআইনিভাবে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত কম অর্থায়নের বাজেট কার্যকর করতে শুরু করেছিল। জানুয়ারিতে কংগ্রেস এমন একটি বাজেট পাস করে, যাতে নাসার বিজ্ঞান খাতের অর্থের বড় অংশই পুনর্বহাল হয়। কিন্তু তাতে আমার মতো বহু গবেষকের জন্য অর্থ সহজলভ্য হয়ে যায়নি।

কেউ বলছিলেন, পরিস্থিতি হয়তো ভালো হবে। আবার কেউ বলছিলেন, আরও খারাপ হতে পারে। সামনে কী আছে, কেউ নিশ্চিত জানত না। আমাদের কাজের প্রকৃতি বিবেচনায় এই অনিশ্চয়তা ছিল গভীরভাবে বিদ্রূপাত্মক।

অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তাই শুধু আমাদের কষ্ট দেয়নি। ২০২৫ সালের মার্চে সংস্থাটি প্রধান বিজ্ঞানীর পদ তুলে দেয়। সর্বশেষ এই পদে ছিলেন একজন জলবায়ু গবেষক। এতে পৃথিবীবিষয়ক গবেষণার জন্য খারাপ ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়। সংস্থাজুড়ে বিভিন্ন বৈঠকে চাঁদ আর মঙ্গলের কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু আমাদের নিজের গ্রহের কথা খুব কম। যেন সৌরজগতের একমাত্র বাসযোগ্য পৃথিবীটি ছিল কেবল পরের চিন্তা।

সূর্য, নক্ষত্র, অন্য গ্রহ ও উপগ্রহ নিয়ে কাজ করা গবেষকরাও কাটছাঁট আর অস্থিরতার মুখে পড়েন। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গ্রন্থাগার বন্ধ হয়ে যায়, সঙ্গে আরও বহু গবেষণাগারও, যাকে বলা হয়েছিল “সমন্বয়”। যেসব অভিজ্ঞ বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বকে আমরা চিনতাম, বিশ্বাস করতাম, তাঁরাও এই অস্থিরতার মধ্যে আমাদের পথ দেখাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। অথচ তাদের ঊর্ধ্বতনদের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান রক্ষার চেয়ে ইমেইলের স্বাক্ষরে সর্বনাম আছে কি না, তা দেখায় বেশি।

নাসা কী, নাসায় বাংলাদেশিরা কেমন ভূমিকা রাখছেন?

আমার জন্য শেষ ধাক্কা আসে মার্চ মাসে, যখন নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে আমাদের কাজকে খাটো করে মন্তব্য করেন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নাসার বিজ্ঞানীরা “রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত” বিষয় নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করলে তা নাসার বৃহত্তর মিশনের জন্য সহায়ক নয়।

এখন আর কেউ আমার মতামতকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরকারি অবস্থান ভেবে ভুল করবেন না, তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি: প্রশাসন যা-ই বলুক, জলবায়ুবিজ্ঞান নিজে থেকে রাজনৈতিক নয়। আমার সঙ্গে কাজ করা কেউই নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রাখতেন না, এমন ইচ্ছাও ছিল না। আমাদের কাজ ছিল প্রকৃতির নিয়ম বোঝা, আর সেই নিয়ম ক্ষমতায় কে আছে তার ওপর নির্ভর করে বদলে যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে কী করা উচিত, তা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত মানুষের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু নীতি নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে প্রশাসন বরং বিজ্ঞানের ওপরই আঘাত হানার পথ বেছে নিয়েছে। তারা কার্যত জাতীয় জলবায়ু মূল্যায়ন বন্ধ করে দিয়েছে, জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের গবেষকদের ছাঁটাই করেছে, আর নাসার বিজ্ঞানীদের ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। এখন তারা আবহাওয়া ও জলবায়ুবিজ্ঞানের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান, জাতীয় বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণা কেন্দ্রকেও ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

সত্যটা হলো, আমরা ইতিমধ্যেই জলবায়ু বিপর্যয়ের শুরুর পর্যায়ে আছি। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে বসন্তের তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে। কলোরাডো নদী অববাহিকায় আগেই থাকা তীব্র খরা আরও খারাপ হচ্ছে, কারণ রকি পর্বতমালায় তুষারপাত রেকর্ড পরিমাণ কম। উচ্চ তাপমাত্রা, শুকনো উদ্ভিদ আর কম বৃষ্টিপাত মিলিয়ে সামনে ভয়াবহ দাবানলের মৌসুম আসতে পারে।

How Exactly Does Carbon Dioxide Cause Global Warming? – State of the Planet

গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বড় ধরনের কাটছাঁট না এলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কেবলই বাড়বে। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হবে, অনেক পাড়া বীমার অযোগ্য কিংবা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে, খাদ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধাক্কা অস্থিরতা তৈরি করবে। শেষ পর্যন্ত নাসার প্রশাসককেও হয়তো স্বীকার করতে হবে, পরিস্থিতি সত্যিই বিপর্যয়কর।

তবু পৃথিবী নিয়ে নাসার গবেষণায় বিস্ময়ের ঘাটতি নেই। এমন উপগ্রহ আছে, যা সাগরকে অপূর্ব রঙে দেখতে দেয়। অতীতের জলবায়ুর খণ্ডিত রেকর্ড জোড়া লাগানো হয়েছে। উচ্চ-রেজোলিউশনের মডেলে দেখা যায় ধোঁয়া আর দূষণ কীভাবে বায়ুমণ্ডলে ঘুরে বেড়ায়। এই অদ্ভুত সুন্দর জগতে বেঁচে থাকতে পেরে আমি মুগ্ধ, অভিভূত এবং কৃতজ্ঞ। আরও জানতে ইচ্ছা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

মানুষ বিনা খরচায় এই জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পায় নাসার কারণেই। সরকারি অর্থে পরিচালিত বিজ্ঞানের প্রতিশ্রুতি সবসময়ই ছিল এটাই—সবার জন্য আবিষ্কার, বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে আরও বড় আর ভালো কিছু হয়ে ওঠার অঙ্গীকার।

নাসা এখনও অনুপ্রেরণার সেই ধারণা ধরে রাখতে চায়। হয়তো আর্তেমিস-২ নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরলে নতুন এক প্রজন্ম উপর থেকে পৃথিবীকে দেখার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে নাসা বৈজ্ঞানিক ধারাটিকেই সংকুচিত করছে, আর আমাদের নিজের গ্রহকে দেখা ও বোঝার ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে। জলবায়ুবিজ্ঞান যে উপকার দিতে পারে, তা সবার প্রাপ্য—বর্তমানকে বোঝা, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করার সামর্থ্য, আর বদলে যেতে থাকা পৃথিবীকে জানার নিখাদ আনন্দ। বিজ্ঞান না থাকলে মহাকাশ থেকে দেখা পৃথিবীর সেই অসাধারণ ছবিগুলো কেবল সুন্দর ছবি হয়েই থাকে। আমাদের প্রাপ্য তার চেয়ে অনেক বেশি।