১৯১০ সালে এক ব্রিটিশ সাংবাদিক “দ্য গ্রেট ইল্যুশন” নামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন, যা ইতিহাসের সবচেয়ে ভুল সময়ে জনপ্রিয় হওয়া বইগুলোর একটি।
লেখক নরম্যান অ্যাঞ্জেল যুক্তি দিয়েছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযোগ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কোনো পক্ষই প্রকৃত অর্থে একটি বিশ্বযুদ্ধ জিততে পারবে না। জার্মানি যদি ব্রিটেন আক্রমণ করে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে থাকা সব স্বর্ণও দখল করে নেয়, তবু ইউরোপের ব্যাংকিং ব্যবস্থার পারস্পরিক নির্ভরতা এমন এক আর্থিক সংকট তৈরি করবে, যাতে জার্মানির অবস্থা ঘরে বসে থাকার চেয়েও খারাপ হবে।
অ্যাঞ্জেল লিখেছিলেন, এই বাস্তবতা যুদ্ধকে অসম্ভব করে না। কিন্তু এটি সংঘাতকে সবার জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও ধ্বংসাত্মক করে তোলে। চার বছর পরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯১৪ সালের অত্যন্ত সংযুক্ত বিশ্বে যুদ্ধের অভিঘাত যুদ্ধক্ষেত্রের বহু বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, যার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বহু বছর ধরে টিকে ছিল।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর মূল প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কি সাময়িক থাকবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী হবে। ইতিহাসের শিক্ষা খুবই সতর্কতামূলক। একটি পরস্পরনির্ভরশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের সূচনাজনিত ধাক্কা রাতারাতি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যার অনেক কিছুই সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান যে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করবে, তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু এর পরবর্তী নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়াগুলো খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পেরেছিল। শুধু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ বিপর্যয়ই নয়, এমন সব উপকরণের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে, যেগুলোর ওপর নির্ভরতার কথা অনেকেই বুঝতেন না। যেমন, বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া, কম্পিউটার চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হিলিয়াম, আর ন্যাফথা—যা আবর্জনার ব্যাগ ও পানির বোতলসহ নানা ঘরোয়া প্লাস্টিক পণ্য তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস দেখায়, এই ধরনের অস্থিরতা কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
১৯১৪ সালে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, বড় ধরনের সংঘাতের অনভিপ্রেত অর্থনৈতিক পরিণতি থাকবে। অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড ও তাঁর স্ত্রী সোফির হত্যাকাণ্ডের পরপরই বাজার ভেঙে পড়েনি। কিন্তু প্রায় এক মাস পরে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে যে আল্টিমেটাম দেয়, যা যুদ্ধকে অনিবার্য বলে মনে করা হয়, সেটিই বিশ্বজুড়ে নিরাপদ আর্থিক আশ্রয়ের দিকে বিশৃঙ্খল দৌড় শুরু করে।
বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বিক্রি করে স্বর্ণের দিকে ছুটে যায়। বহু জায়গায় ব্যাংকে একসঙ্গে অর্থ তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে। লন্ডন থেকে জোহানেসবার্গ, সাংহাই থেকে সিডনি—প্রায় সব শেয়ারবাজারই বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের আর্থিক কেন্দ্র লন্ডনের ব্যাংকগুলোও ধসের মুখে পড়ে। ব্যবসায়ীরা সর্বত্র সেই ঋণসুবিধা হারিয়ে ফেলেন, যার ওপর দৈনন্দিন বাণিজ্য নির্ভর করত।
এরপর বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল থমকে যায়। সংঘাতের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সামুদ্রিক বিমার খরচ দ্রুত ওঠানামা করতে থাকে। জাহাজ ও পণ্যবাহী কার্গো অলস অবস্থায় পড়ে থাকে, বিশ্বজুড়ে বন্দরগুলো জটলায় আটকে যায়। একই সময়ে অবরোধ এবং বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে জার্মান আগ্রাসনের কারণে মহাদেশীয় ইউরোপের সবচেয়ে বড় বাজারগুলো স্বাভাবিক আমদানির সামান্য অংশও গ্রহণ করতে পারেনি।
অর্থাৎ পশ্চিম ফ্রন্টে ট্রেঞ্চ তৈরি হওয়ার আগেই বিশ্ব বাণিজ্য তিন দিক থেকে একসঙ্গে ভয়াবহ আঘাত পায়—ঋণ হারিয়ে যায়, জাহাজ কমে যায়, বাজার অচল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক, বৈশ্বিক এবং গুরুতর। বেকারত্ব বাড়ে, মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়, গণঅস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
১৯১৫ সালের মধ্যে মিত্রশক্তি ও নিরপেক্ষ দেশগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে হয়েছিল। আবার জাহাজ চলা শুরু হয়, বাণিজ্য নতুন রুট ও নতুন বাজারে ঘুরে যায়, আর যুদ্ধ চিলির নাইট্রেট ও ভারতের পাটের মতো পণ্যের বিপুল চাহিদা তৈরি করে।

কিন্তু এরই মধ্যে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে।
১৯১৪ সালের আগস্টে ব্রিটিশ সরকার ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড একসঙ্গে কাজ করে ব্রিটেনের প্রধান ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। কিন্তু সেই গ্রীষ্মের আতঙ্ক ব্রিটিশ ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে দেয়, আর সেই সুযোগে ওয়াল স্ট্রিট বিশ্বের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে লন্ডনের জায়গা দখল করে। প্রায় রাতারাতিই বৈশ্বিক আর্থিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়।
এরপর জাহাজের ঘাটতি, বিমা ব্যয়ের উল্লম্ফন এবং ভাড়া বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, এই চাপ তত বাড়ে। ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালে তা নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৩ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে রুটির দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়।
সবশেষে, ঋণ, জাহাজ ও বাজার—এই তিনের যৌথ ক্ষতির ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের মোট পরিমাণ তীব্রভাবে কমে যায়। যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরতে বহু বছর লেগেছিল। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ডেভিড জ্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুই বছরে প্রকৃত অর্থে বৈশ্বিক রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়, যা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পরের পতনের চেয়েও বেশি।
যুদ্ধজয়ী ইউরোপীয় শক্তিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের পর বিশ্ব বাণিজ্যে ইউরোপের অংশ কমে যায়। যুদ্ধের শুরুতেই সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ইউরোপ থেকে সরে গিয়ে দুটি উদীয়মান শক্তিকে সুবিধা দেয়—যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। ইউরোপীয় বাণিজ্য আর কখনও পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

অবশ্যই, ইরান যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল বা দীর্ঘস্থায়ী নয়। তবু এই নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি টিকে গেলেও, এর অভিঘাত অনেক দিন অনুভূত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
প্রথমত, জ্বালানির দাম খুব দ্রুত যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই। জট পাকানো সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে মাসের পর মাস লাগবে, আর পারস্য উপসাগরের ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন স্থাপনা মেরামতে লাগবে আরও বেশি সময়। জাহাজ চলাচলও একসঙ্গে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। বিশেষ করে ইরান বুঝে গেছে, খুব সস্তা ড্রোন দিয়ে অল্প কয়েকটি ট্যাঙ্কারকে হুমকি দিলেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলা যায়। এখন ইরান যদি হরমুজ প্রণালি পার হওয়া জাহাজের কাছ থেকে অর্থ দাবি করে এবং অর্থ না দিলে ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়, তবে ভাড়া ও বিমা খরচ দীর্ঘ সময় উঁচু থাকবে।
এদিকে বসন্তকালীন আবাদ মৌসুমের শুরুতেই সারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার মধ্যে চালের মতো খাদ্যও রয়েছে। এর অর্থ, শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে এবং দাম বেড়ে যেতে পারে। কোভিড মহামারির অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ ধরনের সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির ঢেউ তৈরি করতে পারে। এই চাপ কমার আগে তা বাড়তি গৃহঋণ সুদ, আর্থিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্ষতিকর প্রভাবও ডেকে আনতে পারে।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব। কিন্তু ২০২০-এর দশকের অন্যান্য সরবরাহ ধাক্কার মতোই এ ক্ষেত্রেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোই সম্ভবত সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবে। খাদ্য ও জ্বালানির বাড়তি দাম যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও অর্থনৈতিক কষ্ট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু বিশ্বের অন্য বহু জায়গায় এটি আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলের কিছু দেশ, যেখানে আগে থেকেই তীব্র খাদ্যসংকট রয়েছে, তারা আমদানি করা সেই সারগুলোর ওপর নির্ভরশীল, যা সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়েই আসে।
যদি মাত্র এক মাসের যুদ্ধের পরিণতি এমন হয়, তাহলে আরও বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। অনেকের মতে, সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সেই আশঙ্কাই বেশি।
১৯১৯ সালে বিধ্বস্ত ইউরোপের দিকে তাকিয়ে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমঁসো বলেছিলেন, যুদ্ধ শুরু করা শান্তি প্রতিষ্ঠার চেয়ে অনেক সহজ। বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। বৈশ্বিক আতঙ্ক সৃষ্টি করা অনেক সহজ, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি ফল সামলানো অনেক কঠিন।

লেখকঃ জেমি মার্টিন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং “দ্য মেডলার্স: সার্বভৌমত্ব, সাম্রাজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনের জন্ম” বইয়ের লেখক। তিনি বর্তমানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে একটি ইতিহাসগ্রন্থ লিখছেন।
জেমি মার্টিন 



















