০৪:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
সোনার দামে একদিনেই বড় পতন, ভরিতে কমল ৪ হাজার ৪৩২ টাকা সাবেক এমপি সাফুরা বেগম রুমী ঢাকায় গ্রেপ্তার যাত্রাবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশে বাড়তে পারে বছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় চীনা পণ্যে শুল্কের চাপ বাড়তেই শুরু নতুন কারসাজি, হিসাব বদলে কমানো হচ্ছে আমদানি খরচ কালবৈশাখীর শঙ্কা ঢাকা-সহ পাঁচ বিভাগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগ নেতা পিটিয়ে হত্যা নাসা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়েছে, কিন্তু আড়ালে এর বিজ্ঞান ভয়াবহ বিশৃঙ্খলায় আমার অধ্যয়নে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত ছিল গভীর। এবার পরিস্থিতি আমাদের ধারণার চেয়েও খারাপ হতে পারে। কংগ্রেস নীরব, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান বদলে বাড়ছে প্রশ্ন

মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ, দাম-রপ্তানি-রিজার্ভে বাড়ছে শঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যখন ভেতরের দুর্বলতা আর বাইরের ধাক্কা একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। মূল্যস্ফীতি এখনও স্বস্তির জায়গায় নামেনি, শিল্প খাতের গতি কমেছে, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা রয়ে গেছে, আর এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেশের মূল্যস্থিতি, রপ্তানি চাহিদা এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর নিকটমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে। আপনার পাঠানো লেখাতেও এই সতর্কতাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো জ্বালানি। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা দ্রুত আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। তেলের দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে, ডলারের চাহিদা বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, আর শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব চলে আসে পরিবহন, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে। বিশ্বব্যাংকও ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হালনাগাদ মূল্যায়নে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল চলতি হিসাব এবং কমে যাওয়া রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

দামের বাজারে এই ঝুঁকি কেন আরও বেশি তা বোঝা কঠিন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা বহিঃখাতের ভারসাম্য ও দেশীয় মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলতে পারে। অর্থাৎ কেবল জ্বালানির দাম নয়, আমদানিনির্ভর খাদ্য, কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য—সব ক্ষেত্রেই নতুন ব্যয়চাপ তৈরি হতে পারে। টাকার বিনিময় হার দুর্বল হলে সেই চাপ আরও বাড়বে। একদিকে বেশি দামে ডলার কিনতে হবে, অন্যদিকে সেই ডলার দিয়ে বেশি দামে পণ্য আমদানি করতে হবে। এই দ্বিমুখী ধাক্কা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এক মাসেই ৬০ হাজার কোটি টাকার আমদানি

রপ্তানির দিকেও স্বস্তি নেই। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস হলেও বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা দুর্বল হলে তার প্রভাব খুব দ্রুত এসে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পর্যালোচ্য সময়ে রপ্তানি দুর্বল ছিল, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় বাজারগুলোর সতর্ক চাহিদা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাব দেখা গেছে। অর্থাৎ বাইরে অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় তত বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।

প্রবাসী আয় নিয়েও তাই বাড়ছে প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের জোরে বহিঃখাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, প্রবাসী আয়ের উল্লম্ফনের কারণে চলতি হিসাব আবার উদ্বৃত্তে ফিরেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে সেই আয়ের ধারাবাহিকতা কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংকও স্পষ্ট করে বলছে, এই সংঘাত দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, কারণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে সামান্য দুর্বলতাও রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং বিনিময় হার—সবকিছুকে নাড়িয়ে দিতে পারে

অর্থনীতির ভেতরের চিত্রও সমানভাবে মিশ্র। কৃষি খাতে ভালো উৎপাদন হয়েছে, যা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। সেবা খাতও মোটামুটি স্থিতিশীল। কিন্তু শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি এক প্রান্তিকে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে নেমে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে চলে আসা দেখাচ্ছে যে উৎপাদন ও বিনিয়োগে দুর্বলতা এখনও কাটেনি। অর্থাৎ অর্থনীতিতে একসঙ্গে দুই ধরনের বাস্তবতা চলছে। একদিকে কিছু খাতে টিকে থাকার শক্তি আছে, অন্যদিকে মূল উৎপাদনভিত্তিক খাতে স্পষ্ট চাপ রয়ে গেছে।

এই অবস্থায় মুদ্রানীতি কঠোর রাখা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক নীতির ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল সুদহার উঁচু রাখলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? বাস্তবতা হলো, বহিঃখাত থেকে আসা ধাক্কা, জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল বিনিয়োগ এবং ব্যাংকিং খাতের পুরোনো অসুখ—এসব একসঙ্গে থাকলে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সব চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য | Sunbd24 - Latest  News Update About DSE, CSE Stock market.

ব্যাংকিং খাতের কথাও এখানে আলাদা করে বলতে হয়। খেলাপি ঋণের অনুপাত কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বলছে, এর বড় অংশ এসেছে নিয়ন্ত্রক শিথিলতার কারণে, মৌলিক উন্নতির কারণে নয়। অর্থাৎ ওপরের দিকে কিছু পরিসংখ্যান স্বস্তি দিলেও ভেতরে দুর্বলতা রয়েই গেছে। আইএমএফও জানুয়ারির মূল্যায়নে বলেছে, বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে আছে দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আহরণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিময় হার সংস্কারে পিছিয়ে থাকা। এর মানে হলো, বাহ্যিক ধাক্কার সময় ভেতরের আর্থিক কাঠামো যথেষ্ট শক্ত না হলে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হালনাগাদেও বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন একটি ছবি উঠে এসেছে। তাদের হিসাবে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলছে, টানা ধীর প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব, চাপে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং মন্থর বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ এখনকার উদ্বেগ কেবল সাময়িক বাজার অস্থিরতা নয়; এটি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য এবং সামাজিক স্থিতির সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।

তবে পুরো ছবিটা কেবল অন্ধকার নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, নতুন সরকার বহিঃঝুঁকি কমাতে অপরিশোধিত তেলের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ সময়সাপেক্ষ হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংকটের সময় সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো বিকল্প প্রস্তুত রাখা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জ্বালানি বাজার, পণ্যবাজার, রপ্তানি চাহিদা এবং রেমিট্যান্স—সবকিছুর ওপর একযোগে ধাক্কা এলে কোনো একক পদক্ষেপ যথেষ্ট হবে না।

মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১%

এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত এবং কঠোর নীতি ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের উৎসকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাত, রাজস্বব্যবস্থা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় এমন সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, যাতে বাইরের ধাক্কা এলেও অর্থনীতি দ্রুত ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, অর্থনীতি এখনো টিকে আছে, কিন্তু তার সহনশীলতা কঠিন পরীক্ষার মুখে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কৃষি, সেবা খাত ও রেমিট্যান্স কিছুটা ভরসা দিলেও মূল্যস্ফীতি, শিল্পে মন্থরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধঘন অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বড় চাপ তৈরি করছে। তাই এখনকার প্রশ্ন শুধু এই নয় যে অর্থনীতি টিকবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, এই ধাক্কা সামলে সামনে এগোতে বাংলাদেশ কত দ্রুত এবং কত গভীরভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

সোনার দামে একদিনেই বড় পতন, ভরিতে কমল ৪ হাজার ৪৩২ টাকা

মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ, দাম-রপ্তানি-রিজার্ভে বাড়ছে শঙ্কা

০২:৩৯:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যখন ভেতরের দুর্বলতা আর বাইরের ধাক্কা একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। মূল্যস্ফীতি এখনও স্বস্তির জায়গায় নামেনি, শিল্প খাতের গতি কমেছে, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা রয়ে গেছে, আর এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেশের মূল্যস্থিতি, রপ্তানি চাহিদা এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর নিকটমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে। আপনার পাঠানো লেখাতেও এই সতর্কতাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো জ্বালানি। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা দ্রুত আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। তেলের দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে, ডলারের চাহিদা বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, আর শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব চলে আসে পরিবহন, উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে। বিশ্বব্যাংকও ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হালনাগাদ মূল্যায়নে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল চলতি হিসাব এবং কমে যাওয়া রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

দামের বাজারে এই ঝুঁকি কেন আরও বেশি তা বোঝা কঠিন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা বহিঃখাতের ভারসাম্য ও দেশীয় মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলতে পারে। অর্থাৎ কেবল জ্বালানির দাম নয়, আমদানিনির্ভর খাদ্য, কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য—সব ক্ষেত্রেই নতুন ব্যয়চাপ তৈরি হতে পারে। টাকার বিনিময় হার দুর্বল হলে সেই চাপ আরও বাড়বে। একদিকে বেশি দামে ডলার কিনতে হবে, অন্যদিকে সেই ডলার দিয়ে বেশি দামে পণ্য আমদানি করতে হবে। এই দ্বিমুখী ধাক্কা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এক মাসেই ৬০ হাজার কোটি টাকার আমদানি

রপ্তানির দিকেও স্বস্তি নেই। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস হলেও বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা দুর্বল হলে তার প্রভাব খুব দ্রুত এসে পড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পর্যালোচ্য সময়ে রপ্তানি দুর্বল ছিল, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় বাজারগুলোর সতর্ক চাহিদা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাব দেখা গেছে। অর্থাৎ বাইরে অনিশ্চয়তা যত বাড়বে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় তত বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।

প্রবাসী আয় নিয়েও তাই বাড়ছে প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের জোরে বহিঃখাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, প্রবাসী আয়ের উল্লম্ফনের কারণে চলতি হিসাব আবার উদ্বৃত্তে ফিরেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে সেই আয়ের ধারাবাহিকতা কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংকও স্পষ্ট করে বলছে, এই সংঘাত দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, কারণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে সামান্য দুর্বলতাও রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং বিনিময় হার—সবকিছুকে নাড়িয়ে দিতে পারে

অর্থনীতির ভেতরের চিত্রও সমানভাবে মিশ্র। কৃষি খাতে ভালো উৎপাদন হয়েছে, যা কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। সেবা খাতও মোটামুটি স্থিতিশীল। কিন্তু শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি এক প্রান্তিকে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে নেমে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে চলে আসা দেখাচ্ছে যে উৎপাদন ও বিনিয়োগে দুর্বলতা এখনও কাটেনি। অর্থাৎ অর্থনীতিতে একসঙ্গে দুই ধরনের বাস্তবতা চলছে। একদিকে কিছু খাতে টিকে থাকার শক্তি আছে, অন্যদিকে মূল উৎপাদনভিত্তিক খাতে স্পষ্ট চাপ রয়ে গেছে।

এই অবস্থায় মুদ্রানীতি কঠোর রাখা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক নীতির ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল সুদহার উঁচু রাখলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? বাস্তবতা হলো, বহিঃখাত থেকে আসা ধাক্কা, জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল বিনিয়োগ এবং ব্যাংকিং খাতের পুরোনো অসুখ—এসব একসঙ্গে থাকলে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সব চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য | Sunbd24 - Latest  News Update About DSE, CSE Stock market.

ব্যাংকিং খাতের কথাও এখানে আলাদা করে বলতে হয়। খেলাপি ঋণের অনুপাত কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বলছে, এর বড় অংশ এসেছে নিয়ন্ত্রক শিথিলতার কারণে, মৌলিক উন্নতির কারণে নয়। অর্থাৎ ওপরের দিকে কিছু পরিসংখ্যান স্বস্তি দিলেও ভেতরে দুর্বলতা রয়েই গেছে। আইএমএফও জানুয়ারির মূল্যায়নে বলেছে, বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে আছে দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আহরণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিময় হার সংস্কারে পিছিয়ে থাকা। এর মানে হলো, বাহ্যিক ধাক্কার সময় ভেতরের আর্থিক কাঠামো যথেষ্ট শক্ত না হলে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হালনাগাদেও বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন একটি ছবি উঠে এসেছে। তাদের হিসাবে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলছে, টানা ধীর প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব, চাপে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং মন্থর বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ এখনকার উদ্বেগ কেবল সাময়িক বাজার অস্থিরতা নয়; এটি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য এবং সামাজিক স্থিতির সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।

তবে পুরো ছবিটা কেবল অন্ধকার নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, নতুন সরকার বহিঃঝুঁকি কমাতে অপরিশোধিত তেলের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ সময়সাপেক্ষ হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংকটের সময় সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো বিকল্প প্রস্তুত রাখা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জ্বালানি বাজার, পণ্যবাজার, রপ্তানি চাহিদা এবং রেমিট্যান্স—সবকিছুর ওপর একযোগে ধাক্কা এলে কোনো একক পদক্ষেপ যথেষ্ট হবে না।

মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১%

এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত এবং কঠোর নীতি ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের উৎসকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাত, রাজস্বব্যবস্থা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় এমন সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, যাতে বাইরের ধাক্কা এলেও অর্থনীতি দ্রুত ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, অর্থনীতি এখনো টিকে আছে, কিন্তু তার সহনশীলতা কঠিন পরীক্ষার মুখে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কৃষি, সেবা খাত ও রেমিট্যান্স কিছুটা ভরসা দিলেও মূল্যস্ফীতি, শিল্পে মন্থরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধঘন অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বড় চাপ তৈরি করছে। তাই এখনকার প্রশ্ন শুধু এই নয় যে অর্থনীতি টিকবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, এই ধাক্কা সামলে সামনে এগোতে বাংলাদেশ কত দ্রুত এবং কত গভীরভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারে।