০৫:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
কাবুলের শোকভূমি: পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রাণঘাতী হামলায় স্বজনহারা মানুষের অন্তহীন আর্তনাদ সোনার দামে একদিনেই বড় পতন, ভরিতে কমল ৪ হাজার ৪৩২ টাকা সাবেক এমপি সাফুরা বেগম রুমী ঢাকায় গ্রেপ্তার যাত্রাবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশে বাড়তে পারে বছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় চীনা পণ্যে শুল্কের চাপ বাড়তেই শুরু নতুন কারসাজি, হিসাব বদলে কমানো হচ্ছে আমদানি খরচ কালবৈশাখীর শঙ্কা ঢাকা-সহ পাঁচ বিভাগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগ নেতা পিটিয়ে হত্যা নাসা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়েছে, কিন্তু আড়ালে এর বিজ্ঞান ভয়াবহ বিশৃঙ্খলায় আমার অধ্যয়নে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত ছিল গভীর। এবার পরিস্থিতি আমাদের ধারণার চেয়েও খারাপ হতে পারে।

নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন সময়সীমা, পাকিস্তানে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য হওয়া যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এই অবস্থায় সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধ থামানোর প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার মাত্র এক দিন পরই তাতে ফাটল দেখা দেওয়ায় কূটনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।

ইসলামাবাদ বৈঠক ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শনিবার ইসলামাবাদে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। লক্ষ্য হলো, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমার মধ্যে বহু বছরের গভীর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কিছুটা হলেও সমাধানের পথ খোঁজা।

তবে আলোচনার প্রস্তুতি চললেও যুদ্ধবিরতির ভিত্তি যে খুব নড়বড়ে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত রবার্ট ম্যালি বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতির শর্তগুলোতে অনেক অস্পষ্টতা আছে। তার ভাষায়, শুরুটাই এত দুর্বল যে সামনে কোন পথে এগোনো যাবে, সেটাই বোঝা কঠিন।

Qalibaf Re-elected As Iranian Parliament Speaker For Sixth Consecutive Year  - Iran Front Page

সমঝোতা নিয়েই দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে দশ দফার একটি সমঝোতামূলক কাঠামো হয়েছিল, তার অন্তত তিনটি ধারা ইতিমধ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে। তার অভিযোগ, লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এমন কোনো শর্ত যুদ্ধবিরতির অংশ ছিল না।

গালিবাফ আরও বলেন, ইরানকে ঘরোয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাতে দেওয়া হবে না— ওয়াশিংটনের এমন অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তার মতে, এমন অবস্থায় দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা যৌক্তিক বলে মনে হয় না। ইসলামাবাদ বৈঠকে ইরানের পক্ষ থেকেও তিনি থাকতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বড় চাপের জায়গা

এই সংকটে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ইরান হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে দেবে কি না। যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে সামরিকীকৃত অবস্থায় নিয়ে যায়। বুধবার রাত পর্যন্তও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি এখন শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপ তৈরিরও বড় অস্ত্র। জ্বালানি ও রাসায়নিক পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহে এর গুরুত্ব এত বেশি যে, ইরান এই পথকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে যুদ্ধবিরতি শুধু যুদ্ধ থামানোর বিষয় নয়, বিশ্ববাজারকেও প্রভাবিত করছে।

হরমুজ প্রণালী কি উন্মুক্ত? ধোঁয়াশা ও উত্তেজনার মধ্যে জাহাজ চলাচল

দুই পক্ষই আপাতত আলোচনা ভেঙে দিতে চাইছে না

কূটনীতিক ও ইরান-বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকাশ্যে দুই পক্ষের বক্তব্যে তীব্রতা থাকলেও তারা অন্তত ইসলামাবাদ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বাঁচিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ, পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও দেশে বাড়তি চাপের মুখে আছেন। জ্বালানির দাম, জনমতের সন্দেহ এবং নিজের সমর্থক শিবিরের ভেতরের অস্বস্তি তাকে দ্রুত কোনো অগ্রগতি দেখাতে বাধ্য করছে।

ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনি বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি নিখুঁত হবে না, বরং এলোমেলো ও অসম্পূর্ণই থাকবে। তবু তার ধারণা, দুই পক্ষই অন্তত আলোচনার টেবিলে কী সম্ভব, তা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।

হোয়াইট হাউসের আশাবাদ, কিন্তু ফারাক রয়ে গেছে

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ইরানের কাছ থেকে এমন একটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে যা আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার মতো কার্যকর ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তিনি এটিকে আগের ইরানি দাবির তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই নতুন প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহে এসব সংবেদনশীল আলোচনা হবে একান্ত দরজা-বন্ধ পরিবেশে।

তবু মূল বিরোধের জায়গা থেকে কোনো পক্ষই সরে আসেনি। ইরান এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে নিজের সার্বভৌম অধিকার বলে মনে করছে। বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করাই তাদের অনড় দাবি। এই একটিমাত্র প্রশ্নই দেখিয়ে দেয়, দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান কতটা গভীর।

Who is Karoline Leavitt? White House's youngest press secretary makes debut  - National | Globalnews.ca

বড় চুক্তির বদলে ছোট ছোট সমঝোতার সম্ভাবনা

রবার্ট ম্যালির মতে, এত কম সময়ের মধ্যে বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো বড় চুক্তিতে পৌঁছানো খুবই কঠিন। তার ধারণা, বরং কয়েকটি সীমিত সমঝোতা হতে পারে, যেখানে হরমুজ প্রণালি, কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ কিংবা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানোর মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের মতো কঠিন প্রশ্ন হয়তো আপাতত পাশ কাটানো হতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত পুরোপুরি সমর্পণের দাবি থেকে তিনি হয়তো কিছুটা নরম হয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের ‘পারমাণবিক ধুলা’ এত গভীরে চাপা পড়ে আছে যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে নজরদারি করে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। তবে সাবেক কূটনীতিক নিকোলাস বার্নস এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইরান আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করবে এবং এমন মার্কিন ছাড় চাইবে, যা ট্রাম্পের পক্ষে দেওয়া কঠিন।

জেডি ভ্যান্সকে সামনে আনার তাৎপর্য

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় জেডি ভ্যান্সকে সামনে আনা ট্রাম্পের কূটনৈতিক কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এর আগে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার দু’দফা আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু সেই সব আলোচনার পরও সংঘাত থামেনি; বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে তেহরান তাদের প্রতি গভীর সন্দেহ পোষণ করতে পারে।

ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, কে এই জেডি ভ্যান্স?

এই জায়গায় ভ্যান্সকে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও আক্রমণের প্রশ্নে তার ব্যক্তিগত আপত্তির কথা উঠে এসেছে। সে কারণে ইরান হয়তো তাকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখতে পারে।

তবে অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের উদ্বেগও কম নয়। তাদের বক্তব্য, ইরান বা পারমাণবিক আলোচনায় বিশেষ দক্ষতা নেই— এমন ব্যক্তিদের দিয়ে আবারও অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক নিকোলাস বার্নস বলেছেন, ফারসি ভাষাজ্ঞান ও ইরানের দরকষাকষির ধরন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের এই আলোচনায় যুক্ত করা উচিত। তা না হলে তা বড় ধরনের কূটনৈতিক ভুল হতে পারে।

ইসরায়েল ও ট্রাম্পের ভেতরের চাপ

এই পুরো সমীকরণে ইসরায়েল একটি অনিশ্চিত চলক হিসেবে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরায়েল যুদ্ধ আবার জোরদার করতে চাইতে পারে। তাদের লক্ষ্য কেবল সংঘাত থামানো নয়, ইরানের অবশিষ্ট ধর্মীয় নেতৃত্বকে হটিয়ে জনপ্রিয় বিদ্রোহ উসকে দেওয়া পর্যন্ত গড়াতে পারে। এতে ট্রাম্পের ঘোষিত সীমিত লক্ষ্য ভেস্তে যেতে পারে।

দেশের ভেতরেও ট্রাম্প চাপে আছেন। ইরানবিরোধী কট্টর শিবির চাইছে না, তিনি এমন কোনো আপস করুন যা যুদ্ধ থামালেও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা অমীমাংসিত রাখে। আবার যুদ্ধবিরোধী প্রভাবশালী কণ্ঠগুলোও তাকে অন্যদিকে টানছে। ফলে ট্রাম্পের অবস্থান যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।

ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুতির ডাক | Barta Bazar

অতিরঞ্জিত বিজয়ের ভাষ্যও সংকট বাড়াচ্ছে

যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত পরাজয়’ ঘটানোর দাবি করে। সেখানে এমন সব মার্কিন ছাড়ের কথা বলা হয়, যেমন পুরো অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, যা ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের অতিরঞ্জিত অভ্যন্তরীণ প্রচারও আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে এমন ভেতরের জয়ের গল্প নতুন কিছু না হলেও, ট্রাম্পের মতো নেতার কাছে তা উসকানিমূলক মনে হতে পারে।

সামনের পথ এখনো অনিশ্চিত

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি আছে, কিন্তু স্থিতি নেই; আলোচনা আছে, কিন্তু আস্থার ভিত্তি নেই। ইসলামাবাদের বৈঠক তাই শুধু আরেকটি বৈঠক নয়, বরং বোঝার চেষ্টা— এই সংঘাত কি সীমিতভাবে ঠেকানো যাবে, নাকি আবারও বড় বিস্ফোরণের দিকে যাবে। আপাতত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ধারণা হলো, বড় কোনো চূড়ান্ত সমাধানের বদলে ছোট ছোট অস্থায়ী সমঝোতার পথই সামনে খুলতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কাবুলের শোকভূমি: পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রাণঘাতী হামলায় স্বজনহারা মানুষের অন্তহীন আর্তনাদ

নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন সময়সীমা, পাকিস্তানে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

০৩:১৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য হওয়া যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এই অবস্থায় সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধ থামানোর প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার মাত্র এক দিন পরই তাতে ফাটল দেখা দেওয়ায় কূটনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।

ইসলামাবাদ বৈঠক ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শনিবার ইসলামাবাদে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। লক্ষ্য হলো, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমার মধ্যে বহু বছরের গভীর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কিছুটা হলেও সমাধানের পথ খোঁজা।

তবে আলোচনার প্রস্তুতি চললেও যুদ্ধবিরতির ভিত্তি যে খুব নড়বড়ে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত রবার্ট ম্যালি বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতির শর্তগুলোতে অনেক অস্পষ্টতা আছে। তার ভাষায়, শুরুটাই এত দুর্বল যে সামনে কোন পথে এগোনো যাবে, সেটাই বোঝা কঠিন।

Qalibaf Re-elected As Iranian Parliament Speaker For Sixth Consecutive Year  - Iran Front Page

সমঝোতা নিয়েই দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে দশ দফার একটি সমঝোতামূলক কাঠামো হয়েছিল, তার অন্তত তিনটি ধারা ইতিমধ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে। তার অভিযোগ, লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এমন কোনো শর্ত যুদ্ধবিরতির অংশ ছিল না।

গালিবাফ আরও বলেন, ইরানকে ঘরোয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাতে দেওয়া হবে না— ওয়াশিংটনের এমন অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তার মতে, এমন অবস্থায় দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা যৌক্তিক বলে মনে হয় না। ইসলামাবাদ বৈঠকে ইরানের পক্ষ থেকেও তিনি থাকতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বড় চাপের জায়গা

এই সংকটে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ইরান হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে দেবে কি না। যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে সামরিকীকৃত অবস্থায় নিয়ে যায়। বুধবার রাত পর্যন্তও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি এখন শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপ তৈরিরও বড় অস্ত্র। জ্বালানি ও রাসায়নিক পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহে এর গুরুত্ব এত বেশি যে, ইরান এই পথকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে যুদ্ধবিরতি শুধু যুদ্ধ থামানোর বিষয় নয়, বিশ্ববাজারকেও প্রভাবিত করছে।

হরমুজ প্রণালী কি উন্মুক্ত? ধোঁয়াশা ও উত্তেজনার মধ্যে জাহাজ চলাচল

দুই পক্ষই আপাতত আলোচনা ভেঙে দিতে চাইছে না

কূটনীতিক ও ইরান-বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকাশ্যে দুই পক্ষের বক্তব্যে তীব্রতা থাকলেও তারা অন্তত ইসলামাবাদ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বাঁচিয়ে রাখতে চাইবে। কারণ, পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও দেশে বাড়তি চাপের মুখে আছেন। জ্বালানির দাম, জনমতের সন্দেহ এবং নিজের সমর্থক শিবিরের ভেতরের অস্বস্তি তাকে দ্রুত কোনো অগ্রগতি দেখাতে বাধ্য করছে।

ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনি বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি নিখুঁত হবে না, বরং এলোমেলো ও অসম্পূর্ণই থাকবে। তবু তার ধারণা, দুই পক্ষই অন্তত আলোচনার টেবিলে কী সম্ভব, তা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।

হোয়াইট হাউসের আশাবাদ, কিন্তু ফারাক রয়ে গেছে

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ইরানের কাছ থেকে এমন একটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে যা আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার মতো কার্যকর ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তিনি এটিকে আগের ইরানি দাবির তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই নতুন প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহে এসব সংবেদনশীল আলোচনা হবে একান্ত দরজা-বন্ধ পরিবেশে।

তবু মূল বিরোধের জায়গা থেকে কোনো পক্ষই সরে আসেনি। ইরান এখনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে নিজের সার্বভৌম অধিকার বলে মনে করছে। বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করাই তাদের অনড় দাবি। এই একটিমাত্র প্রশ্নই দেখিয়ে দেয়, দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান কতটা গভীর।

Who is Karoline Leavitt? White House's youngest press secretary makes debut  - National | Globalnews.ca

বড় চুক্তির বদলে ছোট ছোট সমঝোতার সম্ভাবনা

রবার্ট ম্যালির মতে, এত কম সময়ের মধ্যে বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো বড় চুক্তিতে পৌঁছানো খুবই কঠিন। তার ধারণা, বরং কয়েকটি সীমিত সমঝোতা হতে পারে, যেখানে হরমুজ প্রণালি, কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ কিংবা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানোর মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের মতো কঠিন প্রশ্ন হয়তো আপাতত পাশ কাটানো হতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত পুরোপুরি সমর্পণের দাবি থেকে তিনি হয়তো কিছুটা নরম হয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের ‘পারমাণবিক ধুলা’ এত গভীরে চাপা পড়ে আছে যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে নজরদারি করে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। তবে সাবেক কূটনীতিক নিকোলাস বার্নস এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইরান আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করবে এবং এমন মার্কিন ছাড় চাইবে, যা ট্রাম্পের পক্ষে দেওয়া কঠিন।

জেডি ভ্যান্সকে সামনে আনার তাৎপর্য

বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনায় জেডি ভ্যান্সকে সামনে আনা ট্রাম্পের কূটনৈতিক কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এর আগে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার দু’দফা আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু সেই সব আলোচনার পরও সংঘাত থামেনি; বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে তেহরান তাদের প্রতি গভীর সন্দেহ পোষণ করতে পারে।

ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, কে এই জেডি ভ্যান্স?

এই জায়গায় ভ্যান্সকে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও আক্রমণের প্রশ্নে তার ব্যক্তিগত আপত্তির কথা উঠে এসেছে। সে কারণে ইরান হয়তো তাকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখতে পারে।

তবে অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের উদ্বেগও কম নয়। তাদের বক্তব্য, ইরান বা পারমাণবিক আলোচনায় বিশেষ দক্ষতা নেই— এমন ব্যক্তিদের দিয়ে আবারও অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক নিকোলাস বার্নস বলেছেন, ফারসি ভাষাজ্ঞান ও ইরানের দরকষাকষির ধরন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের এই আলোচনায় যুক্ত করা উচিত। তা না হলে তা বড় ধরনের কূটনৈতিক ভুল হতে পারে।

ইসরায়েল ও ট্রাম্পের ভেতরের চাপ

এই পুরো সমীকরণে ইসরায়েল একটি অনিশ্চিত চলক হিসেবে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরায়েল যুদ্ধ আবার জোরদার করতে চাইতে পারে। তাদের লক্ষ্য কেবল সংঘাত থামানো নয়, ইরানের অবশিষ্ট ধর্মীয় নেতৃত্বকে হটিয়ে জনপ্রিয় বিদ্রোহ উসকে দেওয়া পর্যন্ত গড়াতে পারে। এতে ট্রাম্পের ঘোষিত সীমিত লক্ষ্য ভেস্তে যেতে পারে।

দেশের ভেতরেও ট্রাম্প চাপে আছেন। ইরানবিরোধী কট্টর শিবির চাইছে না, তিনি এমন কোনো আপস করুন যা যুদ্ধ থামালেও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা অমীমাংসিত রাখে। আবার যুদ্ধবিরোধী প্রভাবশালী কণ্ঠগুলোও তাকে অন্যদিকে টানছে। ফলে ট্রাম্পের অবস্থান যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।

ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুতির ডাক | Barta Bazar

অতিরঞ্জিত বিজয়ের ভাষ্যও সংকট বাড়াচ্ছে

যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত পরাজয়’ ঘটানোর দাবি করে। সেখানে এমন সব মার্কিন ছাড়ের কথা বলা হয়, যেমন পুরো অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, যা ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের অতিরঞ্জিত অভ্যন্তরীণ প্রচারও আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে এমন ভেতরের জয়ের গল্প নতুন কিছু না হলেও, ট্রাম্পের মতো নেতার কাছে তা উসকানিমূলক মনে হতে পারে।

সামনের পথ এখনো অনিশ্চিত

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি আছে, কিন্তু স্থিতি নেই; আলোচনা আছে, কিন্তু আস্থার ভিত্তি নেই। ইসলামাবাদের বৈঠক তাই শুধু আরেকটি বৈঠক নয়, বরং বোঝার চেষ্টা— এই সংঘাত কি সীমিতভাবে ঠেকানো যাবে, নাকি আবারও বড় বিস্ফোরণের দিকে যাবে। আপাতত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ধারণা হলো, বড় কোনো চূড়ান্ত সমাধানের বদলে ছোট ছোট অস্থায়ী সমঝোতার পথই সামনে খুলতে পারে।